৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ আজ

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘অর্থনৈতিক

গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে যাচ্ছে। এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে।

বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বাজেটঘাটতি মেটাতে প্রতিবছরের মতো এবারও ব্যাংকঋণের ওপরই বেশি ভরসা রাখছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক খাতে দেড় লাখ কোটি টাকা: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কিছু নতুন কর্মসূচি যুক্ত করা হচ্ছে। আবার বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমসহ কিছু কর্মসূচিতে একদিকে উপকারভোগী বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ানো হচ্ছে ভাতার পরিমাণ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর থেকে প্রথমবারের মতো আটটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। চলতি অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

নতুন কর্মসূচির মধ্যে আরও আছে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী ভাতা কার্যক্রম। কৃষক কার্ড কার্যক্রমে উপকারভোগী ঠিক করা হয়েছে ৪২ লাখ ৫০ হাজার। প্রত্যেক কার্ডধারীকে বছরে দেওয়া হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী কার্যক্রমও নতুন একটি কর্মসূচিতে উপকারভোগী ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬ জন।

আরো থাকছে কর্মহীন শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি। এর আওতায় ১৫ হাজার শ্রমিককে মাসে ভাতা দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ৩ মাস। ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) উপকারভোগী ঠিক করা হয়েছে ১৫ লাখ। একটি সমন্বিত নীতিমালার আওতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে খাল খনন কর্মসূচি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ দুটি বাস্তবায়ন করা হবে।

রাজস্ব খাত সংস্কারে একগুচ্ছ উদ্যোগ:
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামোর প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ধাপে ধাপে করমুক্ত আয় সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন তিনি।

এবারের বাজেটে কর্পোরেট কর পরিপালন ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা, অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজাল থেকে করদাতাদের রেহাই দেওয়ার নানা ঘোষনা আসতে যাচ্ছে। তবে বিদ্যমান কর্পোরেট কর হার আগামী কর বছরে অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড়:
নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০ টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে হ্রাস করে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উৎসে কর হ্রাস করার প্রস্তাব করা হবে। পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ইলেক্ট্রিক বাস ও ট্রাক এবং ইলেক্ট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে কর হার ৫ শতাংশ হতে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারে ঘোষণা আসতে যাচ্ছে।

স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার কমানো হচ্ছে। তরুনদের উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহ যোগাতে সকল ধরনের কন্টেন্ট ক্রিয়েশন হতে আয়কে করমুক্ত করার প্রস্তাব আসতে যাচ্ছে। এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার হতে অর্জিত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনকারী শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শুল্ক-কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব আসছে। কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাছে। পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনকারী শিল্পে রেয়াতি সুবিধা আসতে যাচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments