আপনারা গুলি করলে কি আমরা বসে থাকবো? আমাদের কি গুলি নাই ?

ভারতের সীমান্ত বাহিনী বিএসএফের ‘পুশইন’ নিয়ে দেশের ২৬ জেলা সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তুমুল উত্তেজনা চলছে। দুই দেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তে এখন প্রধান ইস্যু ‘পুশইন’।

বিএসএফের পুশইন সীমান্ত এলাকায় কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। বিজিবিকে সহায়তা করতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। গভীর রাতে মাইকিং শুনে স্থানীয় অনেকেই লাঠি, ফালা ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সীমান্ত এলাকা পাহারা দিচ্ছে।

গত ১০ দিনে সীমান্তের ৩৬টি পয়েন্টে পুশইনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবারও জামালপুরের বকশীগঞ্জের রামরামপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইনে বাধা দেওয়ায় বিজিবি’র সঙ্গে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হয় বিএসএফ।

একপর্যায়ে বিএসএফের এক সদস্য গুলি করার কথা বললে তীব্র প্রতিবাদ জানায় বিজিবির ৩৫ ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক (এডি) ইমাম হোসেন। বিজিবির সহকারী পরিচালক তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আপনারা গুলি করলে কি আমরা বসে থাকবো? আমাদের কি গুলি নাই?

প্রত্যক্ষদর্শী ও বিজিবি সূত্র জানায়, ভারতের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা প্রায় ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি টের পেয়ে জামালপুর ৩৫ বিজিবির সদস্যরা এবং সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজন সেখানে অবস্থান নেন। বাধার মুখে ওই ব্যক্তি শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।

পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সীমান্তে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জামালপুর ৩৫ বিজিবির সহকারী পরিচালক ইমাম হোসেন এবং নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের এক পরিদর্শক নেতৃত্ব দেন। তবে বৈঠকে কোনো সমাধান হয়নি। বিএসএফ ওই ব্যক্তিকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে রেখেই ফিরে যায়।

বৈঠক চলাকালে দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশের দিকে আসতে বাধ্য করছেন বিএসএফের কয়েকজন সদস্য। এসময় বিজিবি সদস্যরা বাধা দেন। এ নিয়ে বিজিবি-বিএসএফ সদস্যদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। বিএসএফ সদস্য ওই ব্যক্তির গায়ে হাত দিয়ে বার বার ঠেলে বাংলাদেশের দিকে যেতে বলেন। তবে ওই ব্যক্তি আসতে চাচ্ছিলেন না।

একপর্যায়ে বিএসএফের একজন সদস্য বলেন, এমন বাড়াবাড়ি করলে গুলি করে দিবো। মুহূর্তে এই কথার প্রতিবাদ করেন ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক ইমাম হোসেন। তিনি পাল্টা বিএসএফ সদস্যদের বলেন, আপনি এ কথা কেন বললেন। আপনি গুলি করলে আমরা কি বসে থাকবো? এসময় বিজিবি’র পেছনে বাংলাদেশ অংশে আনসার সদস্য, পুলিশ ও স্থানীয় কয়েক শতাধিক জনতা লাঠি- সোটা হাতে অবস্থান নেন। তারা ঐ ঐ বলে চেঁচিয়ে উঠেন।

একটা পর্যায়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পিছু হঠেন বিএসএফ সদস্যরা। আর যে ব্যক্তিকে পুশইন করতে চেয়ছিল তিনি গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন।

এরপরও বিএসএফ সদস্যরা কয়েক দফা ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের অবস্থানের কারণে তারা সফল হতে পারেনি।

জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আজ সকালে এক ব্যক্তিকে ভারত থেকে শূন্যরেখায় ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের সদস্যরা সেখানে অবস্থান নিয়েছে।’

দিল্লীতে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক ঃ সম্মেলনের তৃতীয় দিন দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন কমিটি বৈঠক করে। বৈঠকে দুই দেশের নদীর মধ্যে সীমান্ত নিয়ে অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগরতলা থেকে আখাউড়াগামী ৪টি খালের বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও ফেনীর বিলোনিয়া থানাধীন ফেনী নদী সংলগ্ন ৯০ একর আয়তনের মুহুরীর চরের সীমান্ত পিলার স্থাপনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়।

বৈঠকের চতুর্থ দিন আজ বৃহস্পতিবার দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে স্বাক্ষর হবে। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বৈঠক শেষ হবে।

উল্লেখ্য, ভারত থেকে ২০২৫ সালে ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাভাষী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে পুশইন শুরু হয়। ওই বছর দুই হাজার ৩৫৬ জনকে পুশইন করা হয়। তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ১৩৪, রোহিঙ্গা ২২৬ ও বাংলাদেশি নাগরিক এক হাজার ৯৯৬ জন।

এর মধ্যে দুই হাজার ১৫৬ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছিল বিজিবি। তবে ২০২৬ সালে কাউকে বাংলাদেশে পুশইন করতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পর আবার পুশইনের চেষ্টা শুরু করে বিএসএফ। এই দফায় ১০ দিনে সীমান্তের ৩৬টি পয়েন্টে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments