জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গতানুগতিক প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় অর্থনীতির নানা সংকটের স্বৃকৃতি মিলেছে। সংস্কারের নানা উদ্যেগের কথাও এসেছে। গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা অর্জন, পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে মধ্যমেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করেছি।

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক নীতি, কার্যকর সংস্কার ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। অবশ্য স্থিতিশিলতা ফেরাতে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো, দেশীয় শিল্পে সুরক্ষার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা এই বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু ছাড় মিললেও করপোরেট কর হারে ছাড় মেলেনি। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহায়তার ঘোষণায়, ‘ক্রিয়েটিভ’ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার উদ্যোগ বাস্তবান হলে আস্থা ফিরবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ব্যবসা শুরু করার অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, একাধিক দপ্তরে বারবার তথ্য জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং সেবাপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে, নতুন বিনিয়োগে গতি বাড়বে এমনটাই আশা অর্থমন্ত্রীর। তবে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু অনিশ্চয়তাও রয়েছে। যুদ্ধ, জ্বলানি বাজারে অস্থিরতা, বাণিজ্য রাজনীতির পরিবর্তন এসবের যে কোন একটি ঘটনাই বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর অর্থনীতির উপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকটের সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় জ্বলানি সংকটের সমধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোরদারে সর্বোচ্চ গুরত্ব দেওয়ার কথা জানান। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পরিকল্পনার কথা জানান। প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উৎসাহিত করতে প্রণোদনার কথাও জানান তিনি।
ইশতেহার বাস্তবায়নে গুরুত্ব:
এবারের প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে। ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সামাজিক খাতের বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিফলন।
চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়ে:
চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে, প্রথম ১০ মাসেই, অর্থাৎ চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই এনবিআরের ওপর আগামী অর্থবছরে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস হতে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ এবং বিগত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। মূলত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগের কারণে বাজেটে ব্যয়ের কাঠামো বড় হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ।
বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস হতে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস হতে নির্বাহ করার জন্য প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা হতে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপকহারে ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৪.০৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এ অবস্থা হতে উত্তরণে আমরা ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়ন করছি।
প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য:
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
দেশীয় অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার একটি সমন্বিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, এসব পদক্ষেপ এবং চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে আরও এগিয়ে যাবে।
জাতীয় বাজেটে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন: জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আগে অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর জাতীয় বাজেট এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে অনুমোদন দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপ্রধান গতকাল ২টা ৪৫ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সে তার কার্যালয়ে বাজেট দলিলে স্বাক্ষর করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে বাজেটটি অনুমোদিত হয়। সংসদ সূত্র জানায়, এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব মো. আব্দুর রহমান খান, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিববৃন্দ এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।



