একটি সুগার মিলের আত্মকাহিনী

রংপুর জেলার ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকল ছয় বছর ধরে বন্ধ মুখ থুবড়ে পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে চিনিকলের উৎপাদন কার্যক্রম।জেলার হাজার হাজার আখচাষি, শত-শত শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিল।চিনিকলটি বন্ধ হওয়ায় এই অঞ্চলের গ্রামীন অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

প্রায় ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এই শিল্পকারখানা এলাকাটি এখন যেন ভূতের বাড়ি।আওয়ামীলীগ সরকারের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করে দ্রুত শ্যামপুর চিনিকল চালু করতে বর্তমান সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে,রংপুরের এক সময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা চিনিকল এলাকাটিতে এখন সুনসান নীরবতা।বেশির ভাগ দপ্তরে তালা ঝুলছে। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মিললেও তাদের মুখে হাসি নেই। ছয় বছর বন্ধ চিনিকলের যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, বদলেযাচ্ছে যন্ত্রপাতি গুলোর রং। বেশির ভাগ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বিকল হয়ে পড়ে আছে আখ পরিবহনে ব্যবহৃত অনেকগুলো ট্রাক্টর ও কয়েকটি ট্রাক। প্রায় ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এই শিল্পকারখানা এলাকাটি এখন যেন ভূতের বাড়ি।

নতুন বিনিয়োগে কৃষিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে কিছু বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাাবনা পাঠানো হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয়রা বলছেন, সভা-সমাবেশ, হরতাল-আন্দোলন করে এটি চালুর ব্যাপারে সরকারের দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। একারণে এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখ চাষিসহ কয়েক হাজারো শ্রমিক-কর্মচারী।

স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষ জনবল ও অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে চিনিকলটি লোকসানের মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। আখের উৎপাদন হ্রাস এবং চিনিকলে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবকে দায়ী করছেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে নতুন করে বিনিয়োগ এবং কৃষিভিত্তিক বিকল্প শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানের কাছে চলতি সংসদে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।

শ্যামপুরের আখচাষি রবিউল ইসলাম বলেন, শ্যামপুর অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে ও বেকার সমস্যা দূরীকরণে এই চিনিকল অবিলম্বে চালু করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি তারেক রহমানের সরকার চাইলে এই এলাকার মানুষের ভাত-কাপড়ের ও কর্মসংস্থানের একমাত্র অবলম্বন শ্যামপুর চিনিকল চালু হবে।

চাষী নুরুল আমিন বলেন, নিজের জায়গা-জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আখ চাষ করতাম। এখন চিনিকল বন্ধ থাকায় সেটাও আর করতে পারছি না। ভীষণ কষ্টে আছি হাতে টাকা পয়সা নেই। আমাদের মতো গরিব চাষিদের স্বার্থে সরকারের উচিত শ্যামপুর চিনিকল বাঁচিয়ে রাখা।

জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে চিনিকলটি চালুর দাবি জানান আখচাষি ফজলুল হক। তিনি জানান, শ্যামপুর চিনিকল চালু থাকা অবস্থায় নিয়মিত আখচাষ করতেন। চিনিকল বন্ধ হবার পর থেকে আখ চাষ বাদ দিয়ে এখন ধান, গম, ভুট্টা, সবজির চাষ আবাদ করছেন।

আখচাষি সমিতির নেতা এমদাদুল হক বলেন, কৃষিনির্ভর এই এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিকায়ন করে এই চিনিকল চালু করতে হবে। যাতে লাভজনক অবস্থানে থেকে পুনরায় চিনিকলের কার্যক্রম পুরোদমে চলতে পারে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করর্পোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ চিনিকলগুলো আবার চালু ও লাভজনকভাবে চালানোর জন্য টাস্কফোর্স গঠন করে ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্র্বতী সরকার।

টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় বিএসএফআইসি।টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল দুটিতে ২০২৭-২৮ মৌসুম থেকে আখ মাড়াই শুরু করতে তিন বছরে পর্যায়ক্রমে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে এ সহায়তার কথা বলা হয়।

বিএসএফআইসির নথিপত্র বলছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্যামপুর চিনিকলের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা চেয়ে গত বছরের ১৩ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

চিঠির জবাবে গত বছরের ৩০ জুলাই বিএসএফআইসিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করর্পোরেশনকে অর্থ বিভাগ থেকে বিগত দুই দশকে ‘পরিচালন ঋণ’ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। বিএসএফআইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং এ বাবদ সরকারি বিপুল ভর্তুকি হ্রাসের উদ্যোগে চিনিকলগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। তাই অর্থ বরাদ্দে অসম্মতি জানায় অর্থ বিভাগ।

শ্যামপুর চিনিকল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান বলেন, মৌসুমি শ্রমিক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। হাসিনা সকারের সিদ্ধান্তে শ্যামপুর চিনিকলের মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হাজারো শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও আখচাষি, বেকার-যুবক, কুলি-মজুরদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

রংপুর জেলা আখ চাষি ও চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি আর মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পিত ফাঁদের কারণে শ্যামপুরসহ দেশের বেশির ভাগ চিনিকল মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাড়াতে না পারায় যে লোকসান দেখানো হয়েছে, সেটাও সরকারের ব্যর্থতা ছিল। এখন বর্তমান সরকারের উচিত হবে আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের রুজি-রুটির এই ঠিকানার দ্বার খুলে দেয়া। যাতে বেকার সমস্যা দূরীকরণসহ স্থানীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ফের গতি ফিরে আসে।

শ্যামপুর চিনিকলের সহকারী ব্যবস্থাপক (ভান্ডার) দেবাশীষ সিংহ রায় জানান, বর্তমানে চিনিকলের মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বেতন-ভাতা কার্যক্রম বন্ধ নেই। স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ২৪ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে ।

২৪ লাখ টাকার মতো ব্যয় হলেও এর বিপরীতে মিলের জমি লিজ দিয়ে বছরে ৬-৭ লাখ টাকার মতো আয় হয়। মিলের জমি, যন্ত্রপাতি, মেশিন, আবাসিক ও প্রশাসনিক ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনবল প্রয়োজন।

শ্যামপুর চিনিকলের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (এক্সটেনশন) জাহিদুল ইসলাম জানান, জয়পুরহাট চিনিকলের আওতায় (সাব-জোন) এবার ৩০০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। মাড়াইয়ের জন্য এখানকার আখ নিয়ে যাওয়া হয় জয়পুরহাট চিনিকলে। নতুন করে মিল চালু কিংবা লাভজনক করতে গেলে কমপক্ষে তিন মৌসুম সময় প্রয়োজন। এক মৌসুমের আখ দিয়ে মিল চালু করা যায় না। এ মৌসুমে বরাদ্দ পেলেও পুরোপুরি চিনি উৎপাদনে যেতে তিন মৌসুম সময় লাগবে।

শ্যামপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে চিনিকলটি চালুর ঘোষণার পর কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়নি।

প্রসঙ্গত,পাকিস্তানের শাসনামলে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরে ১৯৬৪ সালে চিনিকলটি স্থাপিত হয়। ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর নির্মিত এ চিনিকলে ১৯৬৭-৬৮ সালে জাপানি কোম্পানি মিৎসুবিশি আনুষ্ঠানিকভাবে আখমাড়াই কার্যক্রম শুরু করে। তিন বছরেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। দৈনিক আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা রাখা হয় এক হাজার ১৬ টন।

বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ধরা হয় ১০ হাজার ১৬১ টন। ১৯৭২ সালে চিনিকলটি জাতীয়করণ করার সময় বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১০ হাজার টন। তখনো লাভের মুখই দেখত প্রতিষ্ঠানটি। বছরে তিন মাস চালু থাকত চিনিকলের মেশিন।প্রেক্ষাপট বদলের সঙ্গে সঙ্গে লাভের অঙ্ক উল্টো পথে হাঁটতে থাকে।

২০০০ সাল থেকে শুরু হয় ধারাবাহিক লোকসান। ব্যাংক ঋণ, ঋণের সুদ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন খাত মিলে শেষ পর্যন্ত লোকসান বেড়ে হয় কয়েকশ কোটি টাকা। ধকল সামলানোর বিকল্প উপায় না খুঁজে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুম থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শ্যামপুর চিনিকলের কার্যক্রম।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments