লিবিয়ায় জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় : ৩০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য

ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে মানুষ পাচার, লিবিয়ায় জিম্মি করে নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতার হওয়া রাব্বানী ফরাজী (৩৫) মানব পাচারের অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।

সিআইডি জানিয়েছে, নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা রাব্বানী ফরাজী দীর্ঘদিন ধরে একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাব্বানী ফরাজী ও তার ছোট ভাই রুবেল ফরাজী মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে তাদের বড় ভাই আউয়াল ফরাজী। তারা ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে লিবিয়ায় নিয়ে যেত। সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আটক রাখা হতো। পরে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হতো।

সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মানব পাচার ও মুক্তিপণের অর্থ ব্যবহার করে রাব্বানী ফরাজী এবং তার ভাই রুবেল ফরাজী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন করেছেন। তদন্তকারীদের মতে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থের বড় অংশই মানব পাচার ও জিম্মি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত।

প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে তারা খুলনা শহরে বহুতল ভবন নির্মাণসহ বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। এসব সম্পদের বৈধ উৎসের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের নামে থাকা বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানব পাচারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কোথায় এবং কীভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে, এর সঙ্গে আর কারা জড়িত রয়েছে, দেশে-বিদেশে অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত এবং অবৈধ সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ কত—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মানব পাচার শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি দেশের অসংখ্য পরিবারকে নিঃস্ব করে দেওয়া এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে সক্রিয় এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সিআইডির অভিযান অব্যাহত থাকবে।
গ্রেফতারকৃত রাব্বানী ফরাজীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments