রিজার্ভ চুরির মামলার চার্জশিট প্রায় চুড়ান্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় তদন্ত শেষে খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই অভিযোগপত্র নিয়ে মতামত ও সুপারিশ জানতে সিআইডি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডি। তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সুপারিশে সিআইডি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রæয়ারিতে চারটি বার্তার মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্সিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনে মোট ৮১ মিলিয়ন এবং একটি বার্তার মাধ্যমে প্যান এশিয়া ব্যাংকিং কর্পোরেশনে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারসহ মোট ৫টি বার্তার মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলেও প্রায় ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তোলা এই ঘটনায় তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ডিলিং রুম অফিসের যুগ্ম পরিচালক মো. জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার পায় সিআইডি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় বাংলাদেশি, ভারতীয়, চীনা, শ্রীলঙ্কান, জাপানি ও উত্তর কোরীয় নাগরিকসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিআইডিতে মামলার তদন্তকারী টিম পরিবর্তন হয়। এরপর এই মামলা নতুন আঙ্গিকে তদন্তে গতিশীলতা পায়।

পরবর্তীতে আইন মন্ত্রনালয় রিজার্ভ চুরির মামলাটি তদন্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য ছয় সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে সভাপতি করে গঠিত পর্যালোচনা কমিটিতে আইন সচিব, অর্থ মন্ত্রনালয়ের একজন প্রতিনিধি, অ্যাটর্নী জেনারেলের কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি, সিআইডি প্রধান ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পর্যালোচনা কমিটি রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়ার আগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার কার্যালয়ের মতামত ও সুপারিশ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সেই অনুযায়ি গত এপ্রিল মাসে অ্যাটর্নী জেনারেলের কার্যালয়ে সিআইডি থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অ্যাটর্নী জেনারেলের কার্যালয় থেকে আমরা এখনও কোনো মতামত বা সুপারিশ পাইনি।

তিনি আরো বলেন, মামলায় আসামীর সংখ্যা এখনও নির্দিষ্ট হয়নি। আসামীর তালিকা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে বলা যাবে। আসামীর তালিকা বাংলাদেশীসহ ভারত ও ফিলিপাইনসহ একাধিক দেশের নাগরিক রয়েছে।

সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানসহ ১০ বাংলাদেশির নাম ঃ
খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রিজার্ভ চুরির ঘটনা যথাসময়ে প্রকাশ না করা এবং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে।

অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে আরও রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা। এছাড়া কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, রেজাউল করিম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ নামের আরও তিন বাংলাদেশির নাম অভিযোগপত্রে রয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের পূর্ণ পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি বলে জানা গেছে।

ভারতীয় আইটি উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও অভিযোগঃ
অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ভারতীয় আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানার নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনা প্রকাশের পর তাকে প্রধান করে একটি ফরেনসিক অডিট পরিচালিত হয়েছিল। তবে তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, ওই অডিট চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এছাড়া হ্যাকিং, অর্থপাচার ও চুরির অভিযোগে ভারতীয় নাগরিক প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আগ্রেশ, নীলভান্নান ও মাদুক্কুর আনন্দনের নামও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার ল্যাজারাস গ্রæপের সম্পৃক্ততা ঃ
খসড়া অভিযোগপত্রে বহুল আলোচিত উত্তর কোরীয় হ্যাকার চক্র ‘ল্যাজারাস গ্রæপ’-এর নাম রয়েছে। একই সঙ্গে পার্ক জিন হিয়োকসহ উত্তর কোরিয়ার আরও কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে চীনের গাও শুহুয়াসহ দুই নাগরিক এবং জাপানের সাসাকি নামের এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানও অভিযুক্তঃ
রিজার্ভ চুরির অর্থের একটি অংশ শ্রীলঙ্কার মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরাসহ দেশটির আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া ফিলিপাইনের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো, কাম সিন অংসহ মোট ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, চুরি হওয়া অর্থ বিভিন্ন ধাপে স্থানান্তর ও পাচারের সঙ্গে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments