বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি, আমাদের আনন্দ-বেদনার চিরন্তন সাথি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে অবসান ঘটেছিল বাংলা সাহিত্যের এই দীপ্যমান সূর্যের। তবে পার্থিব মহাপ্রয়াণ ঘটলেও তিনি বাঙালির হৃদয়ে, মনে এবং প্রতিদিনের জীবনে স্বমহিমায় বেঁচে আছেন।
বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রধান কারিগর। তাঁর হাত ধরেই ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জিত হয়। এই অর্জন বিশ্বসাহিত্যের বিশাল অঙ্গনে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।
কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ কিংবা চিত্রকলা—সৃজনশীলতার এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তাঁর অনন্য অবদান নেই। তাঁর ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৪টি উপন্যাস এবং ৩৬টি প্রবন্ধগ্রন্থ জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ৯৫টি ছোটগল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘গল্পগুচ্ছ’ এবং ১,৯১৫টি গান নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘গীতবিতান’। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনার সংকলন ৩২ খণ্ড ‘রবীন্দ্র রচনাবলি’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর পত্রসাহিত্য ১৯ খণ্ড ‘চিঠিপত্র’ এবং চারটি পৃথক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্যিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ আধুনিক চিত্রশিল্পীও। জীবনের শেষ ভাগে, প্রায় ৬৫ থেকে ৬৭ বছর বয়সে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে ছবি আঁকা শুরু করেন। কবিতার পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি করতে করতেই নানা রেখা, আকার ও বিমূর্ত চিত্রের জন্ম হতো। ১৯২৪ থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুই হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছেন। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি নিজস্ব আধুনিক শৈলীতে ছবি আঁকতেন। ১৯৩০ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে তাঁর ছবির প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও তাঁর শিল্পকর্ম ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। তাঁর রচনা বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
বাঙালির চিরকালীন আবেগের আশ্রয় আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি বাঁকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রেরণার উৎস। প্রেমে, বিরহে, বর্ষার প্রথম কদমফুলে কিংবা ঝড়ের রাতে—বাঙালির অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে। দুঃখের দিনে সান্ত্বনা, সংগ্রামের দিনে সাহস জোগাতে আজও তাঁর গান ও কবিতা আমাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি সংকট ও বিজয়ের মুহূর্তে রবীন্দ্র-চেতনা বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছে।
‘তোমার সৃষ্টির পথ’
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও কবির সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি। ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই (১৪ শ্রাবণ) জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অস্ত্রোপচারের ঠিক আগে তিনি মুখে মুখে তাঁর শেষ কবিতাটি উচ্চারণ করেছিলেন। কবিতাটি লিখে নিয়েছিলেন রানি চন্দ। সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিমালা—
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে,
হে ছলনাময়ী…”
এই কবিতার মধ্য দিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্তেও কবি পরম সত্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। এর সাত দিন পর, ২২ শ্রাবণ, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
৮৫ বছর আগে কবিগুরু এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তিনি রেখে গেছেন এক অফুরন্ত সৃষ্টির ভাণ্ডার। যত দিন বাংলা ভাষা থাকবে, যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন ২২ শ্রাবণের এই বিষাদ ছুঁয়ে যাবে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়।
কর্মসূচি
কবিগুরুর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট সন্ধ্যা ৭টায় গীতিনাট্য ‘শ্যামা’ পরিবেশনের মাধ্যমে কবিকে শ্রদ্ধা জানাবে। এছাড়া চ্যানেল আই, বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে।



