যা দেখা গেল জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে

৩৬ দিনের রক্তঝরা আন্দোলন, বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া তারুণ্য আর এক দফার গণজোয়ারে স্বৈরাচারের পতনের পর গতকাল বুধবার থেকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। গতকাল ৫ আগস্ট, ২০২৬-এ ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক গণভবন প্রাঙ্গণে এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান। একসময় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত গণভবন আজ রূপ নিয়েছে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের জীবন্ত দলিলে। উদ্বোধনের প্রথম দিনেই সেখানে দেখা গেছে আবেগঘন পরিবেশ। চীনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় নির্মিত এই জাদুঘর ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

গণভবনের ইতিহাস: রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে স্মৃতির জাদুঘর

জাদুঘরে প্রবেশ করতেই একটি দেয়ালে ফুটে উঠেছে গণভবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মিন্টো রোডের প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতেন, যা তখন গণভবন নামে পরিচিত ছিল। পরে ১৯৭৩ সালে বর্তমান শেরেবাংলা নগরে নতুন গণভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি থাকাকালে এখানে বসবাস না করলেও অফিসের কাজে ভবনটি ব্যবহার করতেন।

গত দেড় দশক ধরে এই বিশাল কমপ্লেক্সে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখানেই পরিচালিত হতো তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। প্রাঙ্গণে ছিল নানা ধরনের সবজি, ফল, মাছ, গবাদিপশু ও পাখির খামার এবং একটি টেনিস কোর্ট। তবে সময়ের সঙ্গে এই ভবন স্বৈরশাসনের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের দখলে আসে।

পালিয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য

জাদুঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে গণভবনের ভাঙা দেয়াল ও ক্ষতবিক্ষত অংশগুলো, যা ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি বহন করছে। ভবনের ভেতরের কিছু ধ্বংসাবশেষ এবং উদ্ধার করা নথিপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে আগের অবস্থাতেই।

সবচেয়ে বেশি দর্শক ভিড় করছেন সেই বিশেষ স্ক্রিনের সামনে, যেখানে ৫ আগস্ট গণভবন ত্যাগ করে শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে করে চলে যাওয়ার দৃশ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।

‘আয়নাঘর’ ও চার হাজার শহীদের স্মৃতি

জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ প্রতীকী ‘আয়নাঘর’। গণভবনের দেয়ালে আঁকা হয়েছে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের গ্রাফিতি। ভেতরে বিভিন্ন চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে আন্দোলনের নানা ঘটনা।

সংরক্ষণ করা হয়েছে শেখ হাসিনার শয়নকক্ষ, ব্যবহৃত আলমারি, খাট, বালিশ, ক্ষতিগ্রস্ত আসবাবপত্র। খাটে বিছানো সাদা চাদরে লেখা রয়েছে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের নাম।

এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের গুম, নির্যাতন ও নিপীড়নের স্মৃতি তুলে ধরতে ২২টি প্রতীকী কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা সেখানে প্রবেশ করলে বন্দিদের যন্ত্রণা ও ইতিহাসের নির্মম অধ্যায়ের একটি প্রতীকী অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

এর পাশেই রয়েছে বিশাল একটি মেমোরিয়াল, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহসহ গত ১৬ বছরে নিহত ও নিখোঁজ প্রায় চার হাজার মানুষের নাম সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যে আড়াই হাজারের বেশি প্রতীকী কবর নির্মাণ করা হয়েছে, যার কাজ এখনও চলমান।

রক্তমাখা স্মারক

জাদুঘরের মূল ভবনে সংরক্ষণ করা হয়েছে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। শহীদ আবু সাঈদের শেষ পরিহিত পোশাক, পানির বোতল, ব্যাগ, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক ও সাধারণ মানুষের রক্তমাখা পোশাক, চশমা, হাতঘড়িসহ নানা স্মারক কাচের বাক্সে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব দেখে অনেক দর্শনার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

জাদুঘরে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ১৯টি থিমে মোট ৬২টি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ আকর্ষণ ‘মনসুন থিয়েটার’, যেখানে গত ১৬ বছরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা, আন্দোলন ও দমন-পীড়নের তথ্যচিত্র সার্বক্ষণিক প্রদর্শিত হচ্ছে।

এছাড়া জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র ও তথ্য সম্বলিত প্রদর্শনী পুরো প্রাঙ্গণে সাজানো হয়েছে। রয়েছে ফোয়ারা, প্রতীকী ভাস্কর্য এবং আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্তের স্থিরচিত্র।

দর্শনার্থীদের জন্য নতুন সুবিধা

পুরো গণভবন প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে পাঁচটি নতুন ওয়াকওয়ে। সম্প্রসারণ করা হয়েছে গণভবনের বিখ্যাত লেক। এছাড়া রয়েছে—

  • আধুনিক ফুড কোর্ট
  • প্রার্থনাকক্ষ
  • বিশ্রামাগার
  • টিকিট কাউন্টার
  • স্মারকপণ্য বিক্রয়কেন্দ্র

গণভবনের হেলিপ্যাডকে রূপ দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই মঞ্চ’, যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মরণসভা আয়োজন করা হবে।

সময়সূচি ও প্রবেশমূল্য

সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার এবং সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকবে।

প্রবেশমূল্য:

  • প্রাপ্তবয়স্ক: ৫০ টাকা
  • শিশু: ২০ টাকা
  • সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক: ৫০০ টাকা
  • অন্যান্য বিদেশি নাগরিক: ২,০০০ টাকা
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments