শ্রাবণের বিকেলে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিকে সঙ্গী করেই রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শুরু হয় ‘কনসার্ট ফর ডেমোক্রেসি’। গায়কদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন শ্রোতারাও। নাচের তালে মেতেছেন সবাই। গতকাল বুধবার বিকেলে মেঘলা আকাশ আর থেমে থেমে বৃষ্টির মধ্যেও দর্শকদের উৎসাহে এতটুকুও ভাটা পড়েনি। বরং দুপুর থেকেই কনসার্টস্থলে ভিড় বাড়তে থাকে এবং কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।
জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ‘গণতন্ত্রের শক্তিতে গড়ি সাম্য, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে গতকাল বুধবার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) সহযোগিতায় এ কনসার্টের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি সচিব কানিজ মৌলা। স্বাগত বক্তব্য দেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন)।
শান্তা জাহান ও আলিফের উপস্থাপনায় বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায়। শুরুতেই এস এম আব্দুল ফারাবীর কথায় জুলাইকে স্মরণ করে ‘বাংলাদেশ বুকে জেগে আছে জুলাই’ গানটি পরিবেশিত হয়। এরপর শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা ধারাবাহিকভাবে দুটি সংগীত পরিবেশন করেন। পরে শিল্পী খালেদ মুন্না গেয়ে শোনান ‘আগুন রঙের জুলাই পেরিয়ে’।
নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় গান পরিবেশন করে ব্যান্ডদল ‘রেবেলস’। ব্যান্ড ‘লালন’ পরিবেশন করে তাদের জনপ্রিয় লোকসংগীত ‘জাত গেল জাত গেল’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ এবং ‘খ্যাপারে’। ব্যান্ড ‘এএসআইএআইএস’ পরিবেশন করে নজরুলসংগীতের নতুন সংস্করণ।
এ ছাড়া অ্যাশেজ, ডিফারেন্ট টাচ, লালন, হাইওয়ে, মাইলস ও ওয়ারফেজ কনসার্টে গান পরিবেশন করে।
বৃষ্টির কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে গেলেও দর্শকদের উপস্থিতিতে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। প্রবেশপথে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে কনসার্টস্থলে প্রবেশ করেন তারা। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে ধীরে ধীরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মঞ্চে যখন জুলাইযোদ্ধাদের স্মরণে গান গাইছিলেন শিল্পীরা, ঠিক তখনই সুরের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছিল পুরো উদ্যান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কনসার্ট উপভোগ করতে দেখা যায় হাজারো তরুণ-যুবককে।
অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভেন্যুর বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের মোতায়েন করা হয়।
কনসার্টে অংশ নিতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোনায়েদ ফারহান বলেন,
“কেবল গান শোনার জন্য নয়, জুলাইয়ের স্মৃতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতেই মূলত এখানে উপস্থিত হয়েছি। প্রিয় ব্যান্ডগুলোর পাশাপাশি এই আয়োজনের বার্তাটাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী নওশিন তাবাসসুম বলেন,
“এক মঞ্চে মাইলস, ওয়ারফেজ, ডিফারেন্ট টাচ—এমন আয়োজন খুব একটা দেখা যায় না। তার ওপর এটি সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও অনেক বেশি। বৃষ্টির মধ্যে গান শুনে খুব ভালো লাগছে।”
আয়োজকরা জানান, সংগীতের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দেওয়া হবে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সন্ধ্যা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। প্রিয় ব্যান্ডগুলোর পরিবেশনাকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সৃষ্টি হয় এক ভিন্নমাত্রার উৎসবমুখর পরিবেশ। বিকেল ৩টা থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজন চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি কনসার্ট মঞ্চে জুলাই গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক গানের প্রতিযোগিতা ‘তোমার গানে জাগবে জুলাই’-এর ২০ জন বিজয়ীর হাতে পুরস্কার ও সনদ তুলে দেওয়া হয়।
প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পান আব্দুল্লাহ আল ফারাবী, দ্বিতীয় পুরস্কার পান মহসিন আহমেদ এবং তৃতীয় হন মো. হাফিজুর রহমান।
বিশেষ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ১৭ জনের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে প্রাইজমানি ও সনদপত্র দেওয়া হয়।
তারা হলেন— তাবাসুম কেয়া, রেস্টিভ, শারজিল আমিন সিয়াম, রেদোয়ান আহমেদ, আল মাহিদ (অনুপম), ওবায়দুল মুন্সী, শাহরিয়ার সাগর, সৌরভ পাখি, সোহানুর রহমান, সামিউল আল হাশিম আহন, মো. মামুনুর রশিদ শিপন, সমৃদ্ধি সূচনা, এস. এম. রাশেদ সিরাজী নিপুণ, উম্মে আইমান, রোদসী ইসফার ফাতেমি, আরিয়ান আহমেদ হামীম এবং অন্তর্যামী হালদার।



