৩০০ বছরের শিব মন্দির হারাচ্ছে টেরাকোটার ঐতিহ্য

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গার প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শিব মন্দিরটি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার অমূল্য পোড়ামাটির (টেরাকোটা) নান্দনিক কারুকার্য। সংরক্ষণের অভাব, প্রত্নতাত্ত্বিক তদারকির অনুপস্থিতি এবং স্থানীয়দের অজ্ঞতায় অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে শতাব্দীপ্রাচীন এই স্থাপনার আদি সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে।

অথচ ২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল সরকারি গেজেটের মাধ্যমে মন্দিরটিকে ‘প্রাচীন পুরাকীর্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়া হয়। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, মন্দির পরিচালনা কমিটি, সেবায়েত এমনকি স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশই এ বিষয়ে কিছু জানেন না। মন্দির প্রাঙ্গণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো সাইনবোর্ডও নেই। ফলে এটি যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত একটি প্রত্নসম্পদ, সেই তথ্যই অজানা থেকে গেছে স্থানীয়দের কাছে।

জানা যায়, সরকারি তদারকি না থাকায় ভবনটি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে প্লাস্টার, রং ও মেরামতের কাজ করেছেন। এতে একদিকে মন্দিরের আদি স্থাপত্যশৈলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে দেয়ালে থাকা দুর্লভ টেরাকোটার অলংকরণ অনেকাংশে ঢেকে গেছে বা নষ্ট হয়ে পড়েছে।

ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট সংলগ্ন নাওডাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত একগম্বুজবিশিষ্ট এই শিব মন্দিরটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবেও পরিচিত।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নাওডাঙ্গা পরগনার জমিদার বাহাদুর শিব প্রসাদ বক্সী প্রায় তিনশ বছর আগে মন্দিরটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু একগম্বুজবিশিষ্ট এ মন্দিরে জমিদারি আমল থেকেই নিয়মিত শিবপূজা হয়ে আসছে। মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা পোড়ামাটির কারুকাজ তৎকালীন শিল্পরুচি ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

প্রাচীন পুরাকীর্তি আইন অনুযায়ী, গেজেটভুক্ত প্রত্নস্থাপনায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের সংস্কার, পরিবর্তন বা সংযোজন করা যায় না। কিন্তু এ বিষয়ে অবগত না থাকায় স্থানীয়রা প্রয়োজন মনে করে নিজেরাই মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছেন।

মন্দিরের সেবায়েত সুরেশ চন্দ্র রায় বলেন, এখানে প্রতিদিন নিয়মিত পূজা হয়। প্রতি বছর শিব চতুর্দশী উপলক্ষে হাজারো ভক্তের সমাগমে শিবরাত্রি ব্রত ও বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, “শুনেছিলাম মন্দিরটিকে প্রাচীন পুরাকীর্তি ঘোষণা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি বাস্তবে হয়েছে কি না, তা কখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারিনি। এখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো সাইনবোর্ডও নেই।”

তিনি আরও বলেন, সরকারি কোনো নির্দেশনা বা তদারকি না থাকায় তারা না বুঝেই বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। পরে জানতে পারেন, এতে মন্দিরের প্রাচীন পোড়ামাটির কারুকার্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি শুশীল কুমার রায় ও সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার রায় জানান, প্রায় ৯-১০ বছর আগে রংপুর থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা মন্দিরটি পরিদর্শন করেছিলেন। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।

তাদের ভাষ্য, “মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়া হয়েছে—এমন কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। এখানে কোনো সাইনবোর্ডও লাগানো হয়নি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্তরা এখানে পূজা দিতে আসেন। মন্দিরটি টিকিয়ে রাখতেই বাধ্য হয়ে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করেছি। আগে জানলে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি, তাহলে নিজেরা কোনো ধরনের সংস্কার করতাম না।”

মন্দিরে পূজা দিতে আসা ৭৭ বছর বয়সী খগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ বলেন, “শৈশব থেকে এই মন্দিরে পূজা করে আসছি। এত প্রাচীন মন্দির আশপাশের জেলাগুলোতেও খুব কম আছে। মন্দিরের দেয়ালের অসাধারণ টেরাকোটার নকশাগুলো সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এগুলো রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

কুড়িগ্রাম সদর থেকে আসা দর্শনার্থী সুজন মোহন্ত বলেন, “অনেকের মুখে এই মন্দিরের কথা শুনে দেখতে এসেছি। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। এর টেরাকোটার শিল্পকর্ম সংরক্ষণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

স্থানীয় নির্মল চন্দ্র রায়, বিনয় চন্দ্র রায় ও ধীরেন্দ্র নাথ রায়ও একই দাবি জানিয়ে বলেন, তারা নিয়মিত এই মন্দিরে এলেও কখনো জানতে পারেননি এটি গেজেটভুক্ত প্রাচীন পুরাকীর্তি। তাদের মতে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি ও সাইনবোর্ড থাকলে স্থানীয়রা নিজেরা সংস্কার করতেন না এবং ঐতিহ্যবাহী কারুকাজও ক্ষতিগ্রস্ত হতো না।

এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল বলেন, “মন্দিরটি প্রাচীন পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত। সেখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড থাকার কথা। কেন এখনো তা স্থাপন করা হয়নি, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। আমি সম্প্রতি এখানে দায়িত্ব নিয়েছি।”

তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন কোনো স্থাপনায় অনুমতি ছাড়া সংস্কার করা যায় না। বিশেষ করে ঐতিহাসিক পোড়ামাটির কারুকাজ কোনোভাবেই ঢেকে দেওয়া বা নষ্ট করা যাবে না।

তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই মন্দিরটি পরিদর্শন করা হবে। সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন, সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং মন্দির পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে নাওডাঙ্গার প্রায় তিন শতাব্দী পুরোনো এই শিব মন্দিরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও দুর্লভ টেরাকোটার কারুকার্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments