ধরলা পাড়ে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়
অনিল চন্দ্র রায়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের ধরলা নদীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। এ আয়োজনকে ঘিরে ধরলার দুই পাড়ে এখন উৎসবের আমেজ। প্রতিযোগিতা দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো দর্শনার্থী। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে নদীর পাড় পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়।

ফুলবাড়ী ধরলা সেতুর উত্তরে স্থানীয়দের উদ্যোগে গত ২৬ আগস্ট শুরু হয় এ নৌকা বাইচ। এতে স্থানীয়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মোট ১২টি বড় নৌকা অংশ নেয়। নির্ধারিত দিনে প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে ধরলা নদীতে তৈরি হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
গত ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সেমিফাইনাল। এতে উলিপুর থেকে আসা ‘তামিম বাংলা’ ও হক বাজার এলাকার ‘দাদাভাই’ নামের দুটি নৌকা বিজয়ী হয়ে ফাইনালে উঠেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে সুবিধাজনক দিন দেখে ফাইনাল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
৬, ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, নৌকা বাইচ দেখতে ধরলা নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় আবার কেউ আশপাশের উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করছেন। সড়ক থেকে ধরলা সেতু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে।

নৌকা বাইচ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো নদীপাড়। প্রতিযোগী নৌকাগুলো ঢেউ কেটে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার সময় দর্শকদের করতালি, চিৎকার ও উৎসাহে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
স্থানীয়রা জানান, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার বহু পুরোনো ঐতিহ্যবাহী খেলা। একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত এ প্রতিযোগিতার আয়োজন হলেও বর্তমানে তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে ধরলা নদীতে এমন আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
নৌকা বাইচকে ঘিরে নদীর পাড়ে বসেছে ছোট-বড় নানা ধরনের দোকানপাট। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বাড়তি বেচাকেনার সুযোগ পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীর ধরলা পাড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
খেলা দেখতে আসা দর্শনার্থী অসীম কুমার রায়, ববিতা খাতুন ও রুবিন খাতুন জানান, তারা প্রত্যেকেই প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর থেকে নৌকা বাইচ দেখতে এসেছেন। উপচে পড়া ভিড় ও নানা ভোগান্তি উপেক্ষা করেও গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী মনোমুগ্ধকর খেলা উপভোগ করছেন তারা।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, ‘গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলাটি সত্যিই আনন্দদায়ক। খেলা দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড় দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। নদীর ঢেউয়ের মতো এ খেলা মানুষের মনকে নির্মল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
নৌকা বাইচ দেখতে আসা কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে তেমন কোনো জলাশয় না থাকায় নৌকা বাইচ দেখার সুযোগ খুব একটা হয় না। তাই এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। প্রতিবছর ধরলা নদীর পাড়ে এসে টানা তিন-চার দিন নৌকা বাইচ উপভোগ করি।’

তিনি আরও বলেন, নৌকা বাইচকে ঘিরে ধরলার পাড়ে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে এ খেলা উপভোগ করেন।
নৌকা বাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও খেলা পরিচালনাকারী শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা সামচুজ্জামান হাসু বলেন, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা। সময়ের পরিক্রমায় খেলাটি অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। এ আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ফিরে আসছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছেও এ খেলার পরিচিতি বাড়ছে।
তারা আরও বলেন, নৌকা বাইচসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো যদি পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। সেমিফাইনাল শেষ হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে সুবিধাজনক দিন দেখে ফাইনাল খেলা আয়োজন করা হবে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি বছর ধরলা নদীর তীরে নিয়মিত নৌকা বাইচ আয়োজনেরও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।



