র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মে. জে. (অব.) জিয়াউল আহসান। কাউকে ইনজেকশন পুশ করে, আবার কাউকে মাথায় গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারই বডিগার্ড সেনাসদস্য ইমরুল। ইমরুল বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে কর্মরত।
রবিবার (২১ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই জবানবন্দি দেন ইমরুল। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, “২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে পিক করবে তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে
বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট কখন আসবে, তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে, টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে জিয়া স্যারকে বাসায় নামিয়ে দিই এবং স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে যাই।
ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভার ব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি।
যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করি। অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি যে, কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত ফল ইন (রোল কল) সকাল ৯টায় হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭টায় ফল ইন (রোল কল) হতো এবং জিয়া স্যার পরপর বেশ কয়েক দিন ফল ইন (রোল কল)-এর সময় এসেছিলেন।
জিয়া স্যারের থাকা অবস্থায় একদিন উনি ফোনে কোনো এক জনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ঐ সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল এলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী) ফোন দিয়েছেন।’ জিয়া স্যার তারেক স্যারের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। অন্য প্রান্তে কী বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, ‘স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ (গুম) করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দিন, এটাই আমার ভালো।”
বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ জবানবন্দি রেকর্ড করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। কাঠগড়ায় ছিলেন জিয়াউল আহসান।
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর র্যাব-৪ এর সেইফ হাউজ থেকে দুজন আসামিকে দুইটা মাইক্রোতে নেওয়া হয়। আনুমানিক আধাঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষী পরে বলেন, গাড়ি দুটি থামানো হয়।
আমি যে গাড়িতে ছিলাম, সে গাড়ি থেকে এক জন আসামিকে নামানো হয়। আমি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জিয়াউল আহসান স্যার ঐ আসামিকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন এবং হত্যা করেন। ঐ আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সকলে হাসাহাসি করছিল। ঐ আসামির হাত এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। আসামিকে হত্যা করার পর আমরা গিয়ে স্যারের নির্দেশে গামছাগুলো খুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসি।
আমাদেরকে আমাদের গাড়ি নিয়ে র্যাব-৪ এ চলে যেতে বলেন। জিয়া স্যার অন্য আসামিকে নিয়ে চলে যান। জিয়া স্যার যখন র্যাব-৪-এ ফেরত আসেন, তখন ঐ আসামি তার সঙ্গে ছিল না। কিছু কিছু অপারেশন স্যার আমার অগোচরে করতেন। যেটাতে তিনি প্রয়োজন মনে করতেন, সেটাতে আমাকে নিয়ে যেতেন।’
জবানবন্দিতে ইমরুল বলেন, ‘জিয়াউল স্যারের সঙ্গে এক বছর তিন/চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসেবে থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ করি যে, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এই বিভিন্ন পন্থার মধ্যে ছিল গুলি এবং ইঞ্জেকশন। পূর্বের বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরো ১০/১২ জন ব্যক্তিকে ইঞ্জেকশন পুশ করে হত্যা করেছেন। এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়িতে সংঘটিত হতো। আমি র্যাব থেকে চলে যাওয়ার পর আমি আগের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারিনি।’
এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এই সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি, তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে তার সঙ্গে দেখেছি তিনি ঐ সময় ১৫০/২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে কখনোই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’
জবানবন্দিতে ইমরুল বলেন, চাকরির একটি পর্যায়ে ২০১০-২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব হেডকোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত ছিলাম। জিয়াউল স্যার আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। স্যারের রানার (বডিগার্ড) থাকা অবস্থায় আমার কাজ ছিল সব সময় তার সাথে থাকা। স্যার যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন সেখানে আমাকে নিয়ে যেতেন।
স্যারের সাথে আমি বিভিন্ন জায়গায় যেমন জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি হেডকোয়ার্টার, ডিবির প্রধান কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) ইত্যাদিতে যেতাম। মাঝে মাঝে সচিবালয়ে যেতাম। এছাড়া স্যার বিভিন্ন ব্যক্তির বাসায় যেতেন। তার মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকীর বাসায় যেতেন। আমিও স্যারের সাথে যেতাম। তারেক সিদ্দিকী স্যারের সাথে জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। তারেক সিদ্দিকী স্যারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সাথেও আমার স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল।
জিয়া স্যার যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন তখন তার গাড়িতে অস্ত্র-এ্যামোনিশন থাকতো কিন্তু জিয়া স্যারের গাড়ি বিধায় তা তল্লাশি করা হতো না। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ যেমন মাহবুবুল হক হানিফ, আমির হোসেন আমু এবং জাহাঙ্গীর কবীর নানকদের সাথেও জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। স্যার তাদের বাসায় যেতেন।
রানার হিসেবে যোগদান করার ২০/২৫ দিন পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, “কই তুই?” আমি বলি আমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র্যাব-১ এর সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি দুটি কালো রংয়ের হায়েস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ঐ গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন। গাড়িতে উঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পিছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে।
রাত আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে র্যাব-১ থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রিজের উপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে বেশ কিছুদূর যাই। যাওয়ার পর সেখানে একটি রেল ক্রসিং পড়ে, সেখানে আমার সাথে যারা ছিল তাদের সহায়তায় মরদেহ রেল লাইনের পাশে নিয়ে রাখি। স্যার সেখানে দাঁড়ানো ছিল। জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেল লাইনের উপরে রাখেন। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়।
পিলখানা ঘটনার পর পলাতক ৮/১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেন জিয়াউল
জবানবন্দিতে ইমরুল বলেন, জিয়াউল স্যারের সাথে সুন্দরবন অপারেশনে কয়েকবার যাই। তার মধ্যে একটি অপারেশনে র্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার সদস্যরাও উপস্থিত ছিল। আমরা জঙ্গলের ভিতরের দিকে যাই এবং দেখি সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২/৩ টি লাশ পড়ে আছে।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে “অপারেশন রেবেল হান্ট” নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য। ঐ সময় জিয়াউল আহসান স্যার ৮/১০ জন লোককে হত্যা করেন। যাদেরকে হত্যা করেছেন তারা বিডিআর সদস্য ছিল এবং আমাদের অফিসারদের এরা হত্যা করেছে মর্মে জিয়া স্যার বলেছেন।
এই লোকগুলোকে দুইভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ছিল ইনজেকশন পুশ করে এবং আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের নিকট আর্মি ক্যাম্প আছে তার ভিতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নিয়ে রাখা হতো, তার উপর যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে তাকে রাখা হতো, তার সিমেন্ট ভরা একটি বস্তা নিচে উপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বেবে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
২০১১ সালের রমজান মাসের শেষের দিকে উত্তরা নর্থ টাওয়ার থেকে সামনে গিয়ে দেখি চার জন লোককে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। তারা নাকি ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই অপারেশনটা সাজানো ছিল। ২০১২ সালের প্রথমের দিকে তিনটি মাইক্রোতে করে আমরা ১১ জন আসামি নিয়ে জিয়াউল স্যারের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ওখানে যাই। তাদেরকে বোটে উঠানো হয়। নদীর মাঝখানে নিয়ে পূর্বের ন্যায় এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
২০১২ সালের মাঝামাঝি র্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে দুই জন আসামি নিয়ে স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা এবং মাথায় জমটুপি। আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে আমরা সেখানে পৌঁছাই। সেখানে ভারত থেকে আসামি নিয়ে সিভিল পোশাকে ৪/৫ জন লোক এসে তাদেরকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনার মাঝপথে জিয়াউল স্যার গুলি করে হত্যা করেন।
এসব ঘটনা ছাড়াও আমি বেশ কয়েকবার স্যারের সাথে বরিশালে গিয়েছিলাম এবং র্যাব-৮ এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চর দুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভিতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনো দুই জন, কখনো তিন জন, কখনো চার জন টার্গেটকে পূর্বের ন্যায় হত্যা করে, অর্থাৎ সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে ঐ টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো।



