মাদক উদ্ধার অভিযানে জব্দ করা আলামত ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ গোপন, উদ্ধারকৃত মাদক ও অর্থ আত্মসাৎ, সোর্সমানি না দেওয়া এবং প্রতিবাদ করায় তথ্যদাতাকে (সোর্স) মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর উপপরিচালক (ডিডি) শামিম আহমেদ, উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আবুল খায়ের আদালতে দায়ের করা সিআর মামলা নং-১০৭৯/২০২৬-এ উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলা করার পর তিনি নিজের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত রয়েছেন। আদালত অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দিয়েছেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে উত্তরা সার্কেল থেকে প্রত্যাহার করে ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে উপপরিচালক শামিম আহমেদ এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন।
এদিকে অভিযোগ তদন্তে ডিএনসির পরিচালক (নিরোধ, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা) রাজীব আহসানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সরেজমিন তদন্ত করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ৬ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় পরিচালিত তিনটি পৃথক অভিযানের তথ্য তিনি উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান এবং বিমানবন্দর সার্কেলের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ রোকুনুজ্জামানকে সরবরাহ করেন। ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম অভিযানে ১ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা, দ্বিতীয় অভিযানে ৪০০ গ্রাম হেরোইন এবং তৃতীয় অভিযানে ২০ হাজার পিস ইয়াবা ও ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে উদ্ধার করা আলামত ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আবুল খায়ের দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় অভিযানে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার হলেও মামলার নথিতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। একইভাবে ২০ হাজার পিস ইয়াবার পরিবর্তে প্রকৃত উদ্ধার হওয়া ইয়াবার পরিমাণ ছিল অন্তত ৪০ হাজার পিস এবং ৪০০ গ্রাম হেরোইনের পরিবর্তে প্রায় দেড় কেজি হেরোইন উদ্ধার হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, উদ্ধার হওয়া আলামতের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অভিযানে সহযোগিতার জন্য চুক্তি অনুযায়ী সরকারের বরাদ্দকৃত সোর্সমানিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রথমে তিনি উপপরিচালক শামিম আহমেদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু অভিযোগ তদন্তের পরিবর্তে তাঁকে অফিসে ডেকে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে তিনি ডিএনসির মহাপরিচালকের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মহাপরিচালক পরিদর্শক জিল্লুর রহমানকে ভর্ৎসনা করেন এবং তাঁর প্রাপ্য সোর্সমানি পরিশোধের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
তবে তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবুল খায়ের। তাঁর দাবি, তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব পরিদর্শক জিল্লুর রহমানের আত্মীয় হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তকে প্রভাবিত করার জন্য অভিযুক্তরা অর্থের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।
আবুল খায়ের বলেন, “পশ্চিম সানারপাড়ের এক অভিযানে ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার দেখিয়ে বাকি দুই লাখের বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ইয়াবা ও হেরোইন গায়েব করা, টাকার বিনিময়ে নিরীহ মানুষকে আসামি করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে উপপরিচালক শামিম আহমেদ ও পরিদর্শক জিল্লুর রহমানসহ অন্যরা নির্যাতন করেছেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “আমি আশা করি তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তবে অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় বর্তমানে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি।”



