পল্লবীর অপরাধজগতে নতুন আতঙ্ক ‘ল্যাংড়া রুবেল’

বিএনপি নেতা আলমগীরকে গুলির ঘটনায় মামলা

‘পেপার সানি’ হত্যা মামলার প্রধান আসামির বিরুদ্ধে ফের প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ

রাজধানীর পল্লবী-মিরপুরের অপরাধজগতে আবারও আলোচনায় এসেছে মো. রুবেল ওরফে ‘ল্যাংড়া রুবেল’। অটোরিকশাচালক রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’ হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি এই রুবেলের বিরুদ্ধে এবার প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত শুক্রবার বিকেলে পল্লবী থানাধীন সেকশন-১১, ব্লক-বি, রোড-২ এলাকার একটি চা-স্টলের সামনে আলমগীর হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় তার স্ত্রী রিনা আক্তার বাদী হয়ে শনিবার পল্লবী থানায় মামলা করেছেন।

মামলায় রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া পাপ্পু ওরফে শাকিল আহমেদ ওরফে শাকির আহমেদ ওরফে পাপ্পুকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩ থেকে ৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, পূর্বশত্রুতার জেরে একটি প্রাইভেটকারে করে রুবেল ও তার সহযোগীরা ইমনের চা-স্টলের সামনে আসে। সেখানে বসে থাকা আলমগীর হোসেনকে লক্ষ্য করে রুবেল পিস্তল দিয়ে গুলি চালান।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম গুলিটি আলমগীরের মাথার ডান পাশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাকে লক্ষ্য করে পেটে ও পিঠে আরও দুই রাউন্ড গুলি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় হামলাকারীদের গুলিতে ৬৩ বছর বয়সী পথচারী জোসনার পায়েও গুলি লাগে।

পরে হামলাকারীরা আশপাশের লোকজনকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে প্রাইভেটকারে করে পালিয়ে যায় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের সহায়তায় গুলিবিদ্ধ আলমগীর হোসেনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এজাহারে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আহত জোসনাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পল্লবী থানার তথ্য অনুযায়ী, বাদীর কম্পিউটার টাইপ করা এজাহার রাত ১২টা ৫ মিনিটে থানায় পৌঁছানোর পর মামলাটি রুজু করা হয়। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় করা হয়েছে। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলামকে।

‘পেপার সানি’ হত্যা মামলায়ও প্রধান আসামি

রুবেলের বিরুদ্ধে এটি প্রথম কোনো গুরুতর অভিযোগ নয়। এর আগে অটোরিকশাচালক রাকিবুল হাসান সানি ওরফে ‘পেপার সানি’ হত্যা মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়।

২০২৫ সালের জুনে পল্লবীর মোড়াপাড়া ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতের মা রোজিনা বেগম বাদী হয়ে ১০ জুন পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় এম এম রুবেল ওরফে ল্যাংড়া রুবেলকে ১ নম্বর আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছিল, আড্ডা দেওয়ার কথা বলে সানিকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাকে হাতকড়া পরানো হয় এবং মুখ ও শরীর গামছা দিয়ে বাঁধা অবস্থায় গলা কেটে হত্যা করা হয়।

‘পেপার সানি’ হত্যা মামলার পর এবার প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনায় রুবেলের নাম আসায় পল্লবী-মিরপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিরপুর-১১, কালশী, মোড়াপাড়া ক্যাম্প ও মিল্লাত ক্যাম্প এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক অপরাধী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আলম মোল্লা অভিযোগ করেন, এসব গ্রুপের মধ্যে রুবেল ও তার সহযোগীদের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এক বছর আগে তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে শুক্রবারের মতো প্রকাশ্য হামলার ঘটনা ঘটত না।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রুবেলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তে একাধিক প্রশ্ন

গুলির ঘটনার পর পল্লবী থানা ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত শুরু করেছে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে রুবেলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে। মাদক ব্যবসা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডিবির মিরপুর বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা-সংক্রান্ত বিরোধকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র, প্রাইভেটকার এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সামনে রয়েছে বেশ কিছু প্রশ্ন—জনবহুল এলাকায় কীভাবে অস্ত্রধারীরা এসে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে পালিয়ে গেল? ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি কার? অস্ত্রের উৎস কোথায়? হামলার প্রকৃত কারণ কী? এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘটনার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ কী?

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে আলমগীর হোসেনকে গুলি করার ঘটনার রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি পল্লবী-মিরপুর এলাকার অপরাধী নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

অপরাধের অর্থনৈতিক উৎস খোঁজার দাবি

স্থানীয়দের দাবি, শুধু হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের পেছনের অর্থনৈতিক উৎস খুঁজে বের করতে হবে।

একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের মামলার বর্তমান অবস্থা, জামিন, তদন্তের অগ্রগতি এবং আইনগত পদক্ষেপগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments