দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কারণে দলটির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভা বিভাগের কক্ষে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের শুরুতেই এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তাকে শুভেচ্ছা জানান।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী পদ থেকেও তিনি শিগগিরই পদত্যাগ করবেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপি। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
মনোনয়নপত্রে মির্জা ফখরুলের প্রস্তাবক হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান।
এর আগে গত ৯ আগস্ট নির্বাচন ভবন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা
বিএনপির মহাসচিব পদ ছাড়ার পর দলটির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, নতুন মহাসচিব নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দায়িত্ব রয়েছে। তিনি যেভাবে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই জানানো হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, চিফ হুইপ ও হুইপরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের মধ্যে দলের চেয়ারম্যান স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করেন।
সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন তারা।
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকেও রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে তার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়াকে শুধু সাংবিধানিক পদ পূরণের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের পথও উন্মুক্ত হলো।
দীর্ঘদিন দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে থাকা একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিককে রাষ্ট্রপতি পদে পাঠানোর ফলে একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি দায়িত্ব নিতে পারেন, অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নতুন প্রজন্ম ও নতুন ভারসাম্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুধু একটি সাংবিধানিক পদ পূরণ নয়, বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন এবং জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি কে?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে এবং সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদও শূন্য হবে।
মির্জা ফখরুল প্রায় ১৬ বছর ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অনুপস্থিতিতে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। নতুন মহাসচিব নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রিজভীকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিতে পারেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর আগে সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। পরে ২০১৬ সালের পর তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হয়।
রুহুল কবির রিজভী এর আগে মহাসচিব পদে নির্বাচন করেননি এবং মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন না। ফলে মহাসচিবের পদ শূন্য হলে তাকেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন দলের দায়িত্বশীল নেতারা।
তবে মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করলে তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে—বর্তমান মন্ত্রিসভার কাউকে দেওয়া হবে, নাকি নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।



