চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলি-পদায়ন নিয়ে নানা অভিযোগ, পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর স্ত্রী সিদরাতুল মুনতাহার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে বুধবার রাতে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উচ্চ শব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে ভেস্তে যায় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) আয়োজিত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।
ঘটনাটি নিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পুলিশ লাইন্সের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশে মাদ্রাসা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ শব্দে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং তা থেকে সংঘর্ষের পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের অনেক কর্মকর্তা।
তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না রেঞ্জ পুলিশের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর স্ত্রীকে ঘিরে গত কিছুদিন ধরে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারের আলোচনা চলছে। বিশেষ করে পুনাকের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের বদলি ও পদায়নেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রেঞ্জ পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, ডিআইজির স্ত্রী সিদরাতুল মুনতাহা সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে আসেন। সাধারণত বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে এসে রাত পর্যন্ত অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ, পুলিশ সদস্যদের বদলি ও পদায়নের বিভিন্ন আবেদন নিয়ে ডিআইজির সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয় এবং এসব সিদ্ধান্তে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন।
তবে ডিআইজি কার্যালয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক দায়িত্ব রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকারি কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রেঞ্জ পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে কনস্টেবল থেকে সহকারী উপপরিদর্শক ও উপপরিদর্শক পর্যায়ের কোনো পুলিশ সদস্যকে এক জেলা বা ইউনিট থেকে অন্য জেলা বা ইউনিটে বদলি করতে হলে সংশ্লিষ্ট সদস্য প্রথমে পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করতেন।
পুলিশ সুপারের সুপারিশসহ আবেদন রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে আসার পর নথি তৈরি করা হতো। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে কোথায় পদায়ন করা যেতে পারে বা যাবে না—সে বিষয়ে মতামত দিতেন। সবশেষে ডিআইজি সিদ্ধান্ত দিতেন।
অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান ডিআইজি দায়িত্ব নেওয়ার পর বদলি-পদায়নের সেই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক আবেদন সরাসরি ডিআইজি ও তাঁর স্ত্রীর নজরে যাচ্ছে এবং পছন্দ অনুযায়ী পদায়ন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা।
রেঞ্জ পুলিশের একটি অংশের অভিযোগ, বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। টাকা দিলে পছন্দের জেলা বা গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন এবং টাকা না দিলে অপেক্ষাকৃত কম পছন্দের জায়গায় পদায়ন করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এমনকি ডিআইজির স্ত্রীর সঙ্গে বাসায় থাকা একজন উপপরিদর্শক ও দুই-তিনজন কনস্টেবলের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এই প্রতিবেদকের হাতে কোনো লিখিত প্রমাণ বা অর্থ লেনদেনের নির্ভরযোগ্য নথি নেই। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বডিগার্ড-অর্ডারলিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
ডিআইজির বডিগার্ড, অফিস ও বাসার অর্ডারলিদের কয়েকজনকে আগের কর্মস্থল সিলেট থেকে নিয়ে আসা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন জেলার রিজার্ভ অফিস, ডিস্টোর, রেশন স্টোর ও মোটরযান শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সদস্য বিভিন্ন জেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন করে অর্থ দাবি করছেন। টাকা না দিলে ডিআইজিকে দিয়ে বদলি করে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
পুনাকের ব্যানারে বিভিন্ন জেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
ডিআইজির স্ত্রী সিদরাতুল মুনতাহাকে দিয়ে পুনাকের নামে চট্টগ্রাম রেঞ্জের বিভিন্ন জেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়টিও পুলিশের একটি অংশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চাঁদপুরসহ রেঞ্জের বিভিন্ন জেলায় এমন আয়োজন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সের ঘটনাটি সামনে আসার পর পুনাকের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ধরন ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি অংশের প্রশ্ন, পুনাক একটি কল্যাণমূলক সংগঠন হলেও এর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে।
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
পুলিশের বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেন, ডিআইজি কার্যালয়ে তাঁর স্ত্রীর নিয়মিত উপস্থিতি, পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ এবং বদলির হুমকির মতো অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় বদলি-পদায়নের সাম্প্রতিক নথি, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আবেদন, সুপারিশ, পদায়নের সিদ্ধান্ত এবং অভিযোগে যাদের নাম আসছে তাদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভন্ডুল হয়ে সংঘর্ষের ঘটনা যেন সেই প্রশ্নগুলোই নতুন করে সামনে এনেছে—পুনাকের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের আড়ালে কি রেঞ্জ পুলিশের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত।



