রংপুরে চার খুন: দুই আসামির ডোপ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ

রংপুর নগরীর মাচুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুক্ত দাসের ডোপ টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তাদের মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করেন রংপুর মেডিকেল কলেজের ল্যাবের টেকনোলজিস্টরা। পরে নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালত ডোপ টেস্টের আবেদন মঞ্জুর করার পর আসামিদের নমুনা সংগ্রহের জন্য কারাগারে যাওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণে আসামিদের কারাগার থেকে বাইরে আনা সম্ভব না হওয়ায় রংপুর মেডিকেল কলেজের ল্যাবের টেকনোলজিস্টদের কারাগারে নিয়ে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজের টেকনোলজিস্ট মোহাম্মদ আশরাফ জানান, ডোপ টেস্টের জন্য দুই আসামির ইউরিন স্পেসিমেন বা প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানোর পর পরীক্ষা করা হবে।

এর আগে রোববার দুপুরে নগরীর মাচুয়াপাড়ায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এমপি। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘এখানে এসে জানতে পারলাম, মাদকাসক্তরা গণপতি স্যারকে অনেক ডিস্টার্ব করত। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলায় স্যারসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ বাহিনী দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে।’

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এসব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। রামিশা হত্যা মামলায় দ্রুত সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং বিচারকার্য শেষ হয়েছে। একইভাবে নন্দিনী নামে এক শিশুকন্যা হত্যার ঘটনায় ১৫ দিনের মধ্যে বিচারকার্য শেষ হয়েছে। অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করে গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক রয়েছে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখেছে। জনগণের মধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ না করলে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও সেবনকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

এ সময় রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান, জেলা পরিষদ প্রশাসক সাইফুল ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর। আসামিদের বাইরে আনা হলে তাদের ওপর হামলা কিংবা যেকোনো সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছিল। পরে টেকনোলজিস্টকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাচুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকার প্রতিবেশী মুক্ত দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে গ্রেপ্তার আসামিরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেন। মামলাটি বর্তমানে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।

এদিকে, গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা-বড় ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে ডিবি পুলিশ। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাস বের হয়ে আসেন।

রংপুর ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, ঘটনার বিষয়ে জানতে সিদ্ধার্থের বাবা ও ভাইকে কয়েকবার ডিবি কার্যালয়ে আসতে বলা হয়েছিল। তারা না আসায় বিকেলে তাদের নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও ঘটনার বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ তাদের কাছ থেকে মুচলেকা রেখে দিয়েছে।

এর মধ্যে বুধবার রাতে সিদ্ধার্থ দাসের বড় ভাই পার্থ দাস অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের পর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছে। এতে আলামত নষ্টের অভিযোগ ওঠে।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ছাদ ধোয়া হয়নি। ভুল করে মোটরের সুইচ চালু হয়ে যাওয়ায় ট্যাংক থেকে পানি উপচে ছাদ ভিজে যায়।

চার হত্যার এই ঘটনায় ডোপ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে এখন পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন নিহত পরিবারের স্বজন ও স্থানীয়রা। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, মাদকের সংশ্লিষ্টতা এবং সম্ভাব্য অন্য কোনো যোগসূত্র কতটা স্পষ্ট হয়—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments