রাজধানীর মোহাম্মদপুরে থেমে থেমে চাপাতি হাতে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য চলছে। প্রতিদিনই থানার কোনো না কোনো এলাকায় ছিনতাই ও লুটের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ না করায় অনেক ঘটনাই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। ভোর থেকে রাত—বিভিন্ন সময়ে পথরোধ করে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল সোমবার ভোরে চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় এমন একটি ঘটনা ঘটে। ভোর ৬টার দিকে ৪১/৩৭ সি নম্বর পাঁচতলা ভবনের সামনে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার পথরোধ করে তিন যুবক। তাদের হাতে ছিল খোলা চাপাতি। একটি রিকশায় এসে তারা অন্য রিকশাটির গতিরোধ করে। পেছনের আসনে থাকা দুই যুবক ও চালকের পাশে থাকা আরেকজন চাপাতি হাতে যাত্রীদের ওপর হামলে পড়ে। যাত্রীদের চিৎকারে আশপাশের বাসিন্দাদের ঘুম ভেঙে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে ব্যাগ, মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন নিয়ে তারা পালিয়ে যায়।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি আবদুল হালিম জানান, চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের ছিনতাইয়ের বিষয়টি পুলিশের জানা নেই। তবে জানার পর সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তল্লাশি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, চাপাতি বাহিনীর বিরুদ্ধে রাত ১২টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত পোশাক ও সাদা পোশাকে পুলিশের কয়েকটি টহল দল দায়িত্ব পালন করে। আগের তুলনায় চাপাতি বাহিনীর তৎপরতা অনেক কমেছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
চাপাতির ভয় দেখিয়ে দুই নারীকে ছিনতাই
গত ৩১ মে রাতে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে বাসার গেটের সামনে দুই নারীকে চাপাতি দেখিয়ে তাদের ব্যাগ ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে চাপাতি, পিকআপ ও ছিনতাই করা কিছু মালামাল উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পরে আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পেশাদার ছিনতাইকারী। তারা একসময় মোহাম্মদপুরে বসবাস করলেও পরে নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে এসে এখানে ছিনতাই করতেন।
১১ সেকেন্ডে সর্বস্ব লুট
মোহাম্মদপুরের বসিলা ফিউচার হাউজিংয়ের ৪০ ফুট সড়কেও চাপাতি হাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশা থেকে দুই ব্যক্তি চাপাতি হাতে নেমে এক পথচারীকে ঘিরে ধরেন। মাত্র ১১ সেকেন্ডের মধ্যে তার মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান তারা।
এর আগে গত ৭ আগস্ট ঢাকা উদ্যানের পাঁচ নম্বর সড়কে তিন যুবক চাপাতি হাতে এক সাইকেল আরোহীর পথরোধ করে ৪১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
পুলিশের ওপরও হামলা পাটালি গ্রুপের
শুধু পথচারী নয়, অপরাধীদের ধরতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ জুন র্যাব জানায়, মোহাম্মদপুর, বসিলা ও রায়েরবাজার এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ‘পাটালি গ্রুপের’ সেকেন্ড ইন কমান্ড শামীম পাটালিসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল ও তরবারি উদ্ধারের কথা জানায় র্যাব।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির সদস্যরা নির্দিষ্ট কয়েকটি গলিতে ঢুকলে পুলিশের ওপরও হামলা করত। পথচারীদের সর্বস্ব লুটের অভিযোগও ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
১০৮ স্পটে ২০৫ ছিনতাইকারী
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুরের ১০৮টি স্পটে ২০৫ ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল রাতে মোহাম্মদপুর এলাকায় পুলিশ ও এপিবিএন যৌথভাবে বিশেষ মহড়া ও ‘ব্লক রেইড’ চালিয়ে ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করে।
এ ছাড়া চলতি বছরের মে মাসে মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাইয়ের অভিযোগে দুই ভাই ও তাদের বোনজামাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জুনে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৬ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র্যাব। তাদের কাছ থেকে ১৩টি চাকু, ১২টি ক্ষুর ও একটি চাপাতি উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশ করা হয়।
অভিযোগ না করলে থেকে যায় আড়ালেই
মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের বড় একটি সমস্যা হলো—অনেক ঘটনার অভিযোগ থানায় পৌঁছায় না। ফলে পুলিশের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা এবং বাস্তব চিত্রের মধ্যে পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলা করতে গেলে ঝামেলা ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই নীরবে ক্ষতি মেনে নেন।
ফলে একদিকে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার, অন্যদিকে কয়েকদিন পরই নতুন করে চাপাতি হাতে ছিনতাইকারীদের মাঠে নামার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও কেন একই এলাকায় বারবার ছিনতাইকারীদের দাপট ফিরে আসে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তাদের পেছনের মদদদাতা ও আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীরা যাতে পুনরায় অপরাধে জড়াতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।



