এসআই তরিকুলকে হুমকি দেন পুলিশের এসি আরিফুজ্জামান- বললেন জবানবন্দিতে

জুলাই আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের সুরতহাল প্রতিবেদনেও কারাসাজি করা হয়েছে। নিহতের শরীরে গুলির পরিবর্তে শুধুমাত্র আঘাতের চিহ্ন লিখতে চাপ দেয়া হয়। আবু সাঈদের লাশের সুরতহাল প্রস্তুতকারী পুলিশ সদস্য এসআই তরিকুল ইসলামকে এই চাপ প্রয়োগ করেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন সহকারি পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান আরিফ। তিনি এসআই তরিকুলকে হুমকি দিয়ে বলেন, “সুরতহালে ছররা গুলির আঘাতের কথা লেখা যাবে না। যদি লিখ তাহলে তোকে আওয়ামী লীগের লোক দিয়ে মেরে ফেলবো।” বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এ নিয়ে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহন সম্পন্ন হলো। সাক্ষ্য শেষে তাকে জেরা করেন আসামি পক্ষের কৌসুলিরা। জবানবন্দি গ্রহনকালে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, আব্দুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহম্মেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে এসআই তরিকুল বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই আমি রংপুর মেট্রোপলিটন কোতয়ালী থানা এলাকা এবং হাসপাতালে ইউডি (অপমৃত্যু) ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলাম। বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে রংপুর মেট্রোপলিটন তাজহাট থানার বেতার বার্তার মাধ্যমে জানতে পারি যে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি লাশ আছে, তার সুরতহাল করতে হবে। সঙ্গে থাকা কনস্টেবল লিটন দেবনাথসহ আমরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপস্থিত হই এবং জানতে পারি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একজন ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে, তার নাম আবু সাঈদ। তখন মেডিকেল কলেজের ভিতরে অনেক উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সেখানে অনেক পুলিশ ডিউটিরত ছিল।
তিনি বলেন, সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে কোতয়ালি জোনের সহকারি পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান আরিফ হাসপাতালে আসেন এবং আমাকে বলেন ‘তুমি লাশ দেখেছ? জবাবে আমি বলি, না স্যার আমি লাশ দেখিনি। তারপর তিনি বলেন, ‘তুমি লাশ দেখে আস’। আমি লাশ দেখে এসে আরিফুজ্জামান স্যার কে বলি লাশের শরীরে অসংখ্য ছররা গুলির আঘাত আছে এবং মাথার পিছনে ক্ষত চিহ্ন আছে, সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে যা স্ট্রেচারে রক্ত মাখা অবস্থায় আছে। উনি আমাকে বলেন, সুরতহালে ছররা গুলির আঘাতের কথা লেখা যাবে না। আমি তার কথায় একমত পোষণ না করলে তিনি আমাকে গালিগালাজ শুরু করেন এবং বলেন ‘ব্যাটা তুই কথা শুনবি না? কথা না শুনলে তোকে জামাত শিবির হিসাবে চালান করে দিব’।
তখন হাসপাতালের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। আরিফুজ্জামান স্যার আমাকে বলেন, ‘আমার উপর চাপ আছে, তোকে এটা করতেই হবে’। আমি তার কথায় আবারও রাজি না হয়ে বলি তার কথা মত সুরতহাল প্রস্তুত করলে পরবর্তীতে আমার সমস্যা হতে পারে। তিনি এ কথা শুনে আরো রেগে গিয়ে আমার মৃত বাবা-মা তুলে গালিগালাজ শুরু করেন এবং বলেন ‘তোকে আওয়ামী লীগের লোক দিয়ে মেরে ফেলবো’। তখন আমি ভয় পেয়ে যাই। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে এসি আরিফুজ্জামান স্যার একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে সাথে নিয়ে আসেন। পুনরায় আমাকে সুরতহাল প্রস্তুত করতে চাপ প্রয়োগ করেন। আমি উপায়ান্তর না দেখে রংপুর মেট্রোপলিটনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ সাদাতের উপস্থিতিতে আবু সাঈদের সুরতহাল রিপোর্টে ছররা গুলির কথা বাদ দিয়ে শরীরে অসংখ্য ছোট ছোট ক্ষত চিহ্ন এবং মাথায় আঘাতের চিহ্ন লিখে রিপোর্ট প্রস্তুত করতে বাধ্য হই। পরে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য লাশ হাসপাতালে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করি। এই ত্রুটিপূর্ণ সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে আমাকে বাধ্য করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত: আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ৩০ আসামির মধ্যে ৬ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। বাকিরা পলাতক। গ্রেপ্তারকৃতদের বিচারের সময় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments