- কলাবাগানে পারিবারিক কলহের মর্মান্তিক পরিণতি; আট মাসের শিশুকে রেখে নিভে গেল দুই প্রাণ, অভিযুক্ত শিপন আটক
রাজধানীর কলাবাগানে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী ও শাশুড়িকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার পর নিজেই থানায় গিয়ে হত্যার কথা জানালেন হৃদয় হোসেন শিপন (২৫)। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে মা-মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় শিপনকে আটক করা হয়েছে।
রোববার (২ আগস্ট) সকাল ৯টার আগেই কলাবাগান থানাধীন কাঠালবাগানের আল-আমিন মসজিদ রোডের ৫৫/২ নম্বর বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
নিহতরা হলেন ফারজানা আক্তার রাত্রী (২১) ও তার মা ফিরোজা বেগম (৩৪)। তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলায়। শিপন ও রাত্রী দম্পতি মোহাম্মদপুরের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাদের আট মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
থানায় গিয়ে বললেন, ‘আমি স্ত্রী ও শাশুড়িকে হত্যা করেছি’
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে এলাহী আশিক জানান, ঘটনার পর শিপন নিজেই থানায় এসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের জানান, তিনি তার স্ত্রী ও শাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে আটক করে এবং তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার করে।
পরে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
বিয়ের অনুষ্ঠান থেকেই শুরু বিরোধ
নিহত রাত্রীর বাবা ফারুক হোসেন জানান, তাদের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়। গত শুক্রবারের আগের শুক্রবার স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও মেয়ে রাত্রী গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। গত শুক্রবার ছিল তার এক ভাতিজার বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ের আগের দিন শিপনও সেখানে যান।
তিনি বলেন, “বিয়ের দিন সকালে রাত্রী ও শিপনের মধ্যে কোনো একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। সেই রাগে শিপন বিয়ের অনুষ্ঠানে খাওয়া-দাওয়া না করেই ঢাকায় চলে আসে। এরপর বাসায় কী ঘটেছে, তা আমি জানি না।”
বাসায় গিয়ে দেখেন মেয়ের মরদেহ, পাশে মৃত্যুযন্ত্রণায় স্ত্রী
ফারুক হোসেন জানান, রোববার সকালে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বাসায় ঢুকে দেখেন, মেয়ে রাত্রী ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর পড়ে আছে। আর পাশে তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “মেয়ের মরদেহ বাসায় রেখেই আমি স্ত্রীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।”
পুরোনো বিরোধের জেরে সকালে রক্তাক্ত সংঘর্ষ
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিপন জানিয়েছেন, রোববার সকালে পুরোনো একটি বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে স্ত্রী রাত্রীর তর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে শাশুড়ি ফিরোজা বেগম এসে মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
এরপর ঘরে থাকা একটি ফল কাটার ছুরি এনে প্রথমে স্ত্রী রাত্রীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। শাশুড়ি বাধা দিতে এগিয়ে এলে তাকেও কুপিয়ে আহত করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই রাত্রী মারা যান। তবে তখনও ফিরোজা বেগম জীবিত ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
আট মাসের সন্তান হলো এতিম
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের সময় দম্পতির আট মাস বয়সী সন্তান বাসাতেই ছিল। এক মর্মান্তিক ঘটনায় শিশুটি একই দিনে মা ও নানিকে হারিয়েছে। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
তদন্ত চলছে
ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, দুই মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
কলাবাগান থানা পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক কলহের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযুক্ত শিপনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র উদ্ধার এবং ঘটনার সার্বিক কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন।



