দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাড়ায় গ্যাস সংকট কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এর ফলে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে এবং গত সপ্তাহের তুলনায় বিদ্যুতের লোডশেডিংও কিছুটা কমেছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশে দেশীয় ও আমদানিকৃত গ্যাস মিলিয়ে প্রায় ২৪৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত হয়েছে ১৬১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। আর আমদানিকৃত এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৮২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস।
গ্যাসের সরবরাহ বাড়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহ বেড়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৩ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং গত সপ্তাহের তুলনায় লোডশেডিং কমেছে।
এদিকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ায় শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৩৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে গত তিন সপ্তাহের মধ্যে গতকাল বাসাবাড়িতে গ্যাসের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় উৎপাদন বেড়েছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জেনারেটর চালাতে ব্যবহৃত ডিজেলও কিছুটা কম লেগেছে।
সার কারখানাগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। শনিবার এসব কারখানায় প্রায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এর তাৎক্ষণিক স্থায়ী সমাধান নেই। এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেকটাই প্রকৃতির ওপরও নির্ভর করছে। বৃষ্টি ও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে গত দুই দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কমেছে। ফলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ও মাত্রা কমেছে। তবে গরম বাড়লে আবারও বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং লোডশেডিং বেড়ে যেতে পারে।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮৭ মেগাওয়াট এবং শনিবার সকাল ১১টায় ১৬৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি মিশ্রণে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ যত বেশি থাকবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতিও তত ভালো থাকবে।
টার্মিনাল সংকটে এলএনজি সরবরাহ
দেশে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার টার্মিনাল দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনাল ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। দুটি টার্মিনালই পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর পেট্রোবাংলার টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়ে সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে এর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যায়। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও গাড়ির ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, পেট্রোবাংলার টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটি বয়লারের পুনঃগ্যাসীকরণের সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি থেকে গত ৬ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।
গত শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে ওই বয়লার থেকেও গ্যাস সরবরাহ সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। ত্রুটি মেরামতের পর আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনো চালু করা যায়নি।
বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। এতে টার্মিনাল থেকে প্রায় ৭২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে। তবে কখন এ কাজ শুরু হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সামিট টার্মিনালেও সরবরাহে বিঘ্ন
এদিকে এলএনজি না পাওয়ায় গত সোমবার সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়। মঙ্গলবার তা ২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ১০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করা হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
শুক্রবার বিকেলে ভিটলের একটি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে আসে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সামিট টার্মিনালে ওই জাহাজ থেকে এলএনজি খালাস শুরু হয়। এলএনজি খালাসে প্রায় আট ঘণ্টা সময় লাগে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টা থেকে টার্মিনালে জমা থাকা মজুত থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে সামিট। শুরুতে সাড়ে ৯ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ করা হলেও ভোররাতে তা বেড়ে ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়।
এর আগে বঙ্গোপসাগরে আসা সৌদি আরামকোর এলএনজিবাহী জাহাজ ‘আল-হামরা’ শুক্রবার ফেরত পাঠানো হয়।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত এলএনজি নিয়ে যেসব জাহাজ আসে, সৌদি আরামকোর পাঠানো জাহাজটি তেমন ছিল না। জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের জন্য যে ধরনের সামঞ্জস্য প্রয়োজন, ওই জাহাজে তা ছিল না। এ কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল। বিশেষ করে বর্তমানে সাগর উত্তাল থাকায় জাহাজটি থেকে এলএনজি খালাস করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ আগেই আপত্তি জানালেও আরামকো জাহাজটি পাঠিয়েছিল। কয়েক দিন সাগরে অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত ওই জাহাজ থেকে এলএনজি নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট
দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও মোটামুটি সব খাতের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা সম্ভব। তবে স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট।
এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার আগে এ হারে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে গত শুক্রবার বিকেলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল। এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় বর্তমানে তা প্রায় ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। ফলে সাময়িকভাবে গ্যাস সংকট ও এর প্রভাবে বিদ্যুতের লোডশেডিং কিছুটা কমেছে।



