সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ

উদ্ধার ১৩ হাজার ৬৭৯, এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮

১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের সংখ্যাই বেশি

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ নিখোঁজের ঘটনায় করা জিডির প্রায় ৮৭ শতাংশেরই ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশের পর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকাশিত সংবাদে নিখোঁজ শিশুদের পরবর্তী অবস্থা—কতজন উদ্ধার হয়েছে কিংবা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে—সেই তথ্য উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। পরে জনমনে বিভ্রান্তি দূর করতে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের যাচাই করা তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১ হাজার ৯৭০ জন। অর্থাৎ মোট নিখোঁজের জিডির প্রায় ৯৭ শতাংশই এই বয়সসীমার শিশু-কিশোরদের নিয়ে।

কেন নিখোঁজ হচ্ছে শিশুরা

পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে প্রধানত অসতর্কতা ও অপরিচিত পরিবেশে পথ হারানোর মতো কারণ রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথঘাট ভুলে যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় ভুল পথে চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে।

তবে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে কারণগুলো অপেক্ষাকৃত ভিন্ন। অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জা বা ভয়ের কারণে আত্মগোপন, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব—এসব কারণে তারা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বাড়ছে নিখোঁজের জিডি

পুলিশ বলছে, সাধারণ ডায়েরি করার প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে পুলিশি সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু রয়েছে। এর ফলে আগে থানায় গিয়ে জিডি করার যে প্রক্রিয়া ছিল, তার তুলনায় অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি করা অনেক সহজ হয়েছে। ফলে জিডির সংখ্যাতেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৪১৪টিতে। তবে ২০২৫ সালে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টি। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি।

‘নিখোঁজ’ মানেই দীর্ঘমেয়াদি নিখোঁজ নয়

পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, কোনো শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হওয়ার পর তাকে উদ্ধার করা বা পরিবারের কাছে ফিরে আসার ঘটনাও একই হিসাবের মধ্যে রয়েছে। ফলে শুধু জিডির সংখ্যা দিয়ে দেশে একই সময়ে কতজন শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে—তা নির্ধারণ করা যাবে না।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হলেও এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জন ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। বর্তমানে উদ্ধার হয়নি ২ হাজার ৩৮ জন। পুলিশ বলছে, নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে জিডির পাশাপাশি উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরে আসার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

তবে সাত মাসে দুই হাজারের বেশি শিশুর এখনো উদ্ধার না হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments