সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারিরীক অবস্থার উন্নতি ন্ইে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে টানা সাত দিন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত¡বধায়নে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। মোটেই ঝুঁকিমুক্ত নন তিনি। খালেদা জিয়া চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসকরা। বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা সহায়তায় যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল আজ ঢাকায় আসছে। এরআগে চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল তাঁর মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে মিলে কাজ করছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি রেখেছে বিএনপি। যা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
গত ২৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। ২৭ নভেম্বর থেকে তিনি ওই হাসপাতালের সিসিইউতে আছেন।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করার পর স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা দেওয়া শুরু করেছে।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ব্রিফ করেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ডাক্তাররা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেই চিকিৎসা উনি গ্রহণ করতে পারছেন। অথবা আমরা যদি বলি মেনটেইন করছেন। কাজেই বিভিন্ন ধরনের গুজব, বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় দেখার পরিপ্রেক্ষিতে দলের পক্ষ থেকে আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্বক্ষণিকভাবে উনার চিকিৎসার তদারকি করছেন। চিকিৎসার সমস্ত বিষয়ে উনি দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে আমাদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন।’
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কাতার, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ভারত ইতোমধ্যে চিকিৎসা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার জন্য দেশের বাইরে নেওয়ার জন্য যে কথাটি আমি পূর্বেও বলেছি, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা উনাকে দেখেছেন। আজকেও ইউকে থেকে উনাকে দেখার জন্য বিশেষজ্ঞ আসবেন এবং উনারা দেখবেন। দেখার পরবর্তীতে উনাকে যদি ট্রান্সফারেবল (স্থানাস্তরযোগ্য) হয়, আমাদের যদি ট্রান্সফার করার প্রয়োজন পড়ে, মেডিকেল বোর্ড মনে করে, তখনই তাঁকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে।’
এই যাত্রায় খালেদা জিয়ার সুস্থ হয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা এই সংকটময় মুহূর্তে আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে উনার সুস্থতার জন্য দোয়া চাই এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় দেশবাসীর দোয়া, সারা পৃথিবীর অনেক মানুষের উনার প্রতি ভালোবাসা এবং দোয়ার কারণেই হয়তোবা উনি এই যাত্রায় সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আমরা আশা করি।’
ডা. জাহিদ বলেন, আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে; কিন্তু সর্বোচ্চটা মনে রাখতে হবে যে, রোগীর বর্তমান অবস্থা এবং সর্বোপরি মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ এই মুহূর্তে আমাদের নেই।
খালেদা জিয়াকে নিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার আহŸান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং সেই সাথে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান না দেওয়ার জন্য পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ করছি। আমাদের দল কীভাবে আপনাদেরকে ইনফরমেশন দেবে, সেটিও আমাদের দলের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ব্রিফিংয়ের একপর্যায়ে কেঁদে ওঠেন অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ মেহেরবানিতে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে আজ দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক, সেটি প্রমাণিত। সেই লক্ষ্যেই আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করেছেন ধৈর্য ধারণ করার জন্য। উনি বিরামহীনভাবে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল টিমের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। কাজেই আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। অধ্যাপক জাহিদ জানান, অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সেবায় কাজ করছেন। এ মেডিকেল বোর্ড রয়েছেন, অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী, অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক এ কিউ এম মহসিন, অধ্যাপক শামসুল আরেফিন, অধ্যাপক জিয়াউল হক, অধ্যাপক মাসুম কামাল, অধ্যাপক এ জেড এম সালেহ, অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাইফুল ইসলাম ও ডাক্তার জাফর ইকবাল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক রফিকউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জন হ্যামিল্টন, অধ্যাপক হামিদ রব, যুক্তরাজ্য থেকে অধ্যাপক জন প্যাট্রিক, অধ্যাপক জেনিফার ক্রস এবং পুত্রবধূ ডাক্তার জুবাইদা রহমান।
তিন বাহিনীর প্রধানগণ দেখতে গেলেনঃ
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান গতকাল মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়েছেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এই তথ্য জানিয়েছে।
সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত:
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে মঙ্গলবার রাজধানী শ্যামলীতে নিজ বাসভবনে কুরআন খতম ও সাদাকায়ে জারিয়া দিয়েছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া এ দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক। বহু সংকটময় সময়ে তিনি জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কখনো দেশ ত্যাগ করেননি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় শুধু বিএনপি নয়, সারাদেশের সাধারণ জনগণ গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনায় আক্রান্ত। এছাড়াও মঙ্গলবার বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৃথকভাবে জাতীয়তাবাদী যুবদল ও ছাত্রদল দোয়া ও মাহফিলের আয়োজন করে। এসময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



