ইনকিলাব মঞ্চের আহŸায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে বিদেশে নেওয়ার ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক চিকিৎসক। রবিবার দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, হাদির অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক, তাকে বিদেশে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যগুলো (কেস সামারি) থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের কয়েকটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে তাকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে তার পরিবার ও মেডিকেল বোর্ডের উপর।
এ বিষয়ে মেডিকেল বোর্ড বলছে, রোগীর পরিবার অথবা পরিবারের মাধ্যমে সরকার যদি রোগীকে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও মেডিকেল বোর্ড ‘সর্বাত্মক সহযোগিতা’র জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
মস্তিষ্কের কেন্দ্রে গুলির একটি অংশ এখনো রয়ে গেছে জানিয়ে ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, ‘শুক্রবার অপারেশনের সময় আমরা তার মাথায় বুলেটের একটা ফ্রাগমেন্ট পেয়েছি, এটা কাভার বা শেল হতে পারে। এটাকে আমরা অপারেশনের সময় বের করতে পেরেছি। আরেকটা অংশ তার ব্রেইন স্টেমের মধ্যে রয়ে গেছে। আর একটা অংশ আরেক পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। গুলিটা ভাগ হয়ে একটা অংশ বের হয়ে গেছে; আরেকটা ছোট অংশ ব্রেইন স্টেমের মধ্যে রয়ে গেছে। আর একটা কাভার আমরা অপারেশনের সময় বের করেছি।
থেকে যাওয়া গুলির অংশ অপারেশন করে বের করা যাবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে চিকিৎসক আহাদ বলেন, এইসব ক্ষেত্রে আমরা রিস্ক বেনিফিট চিন্তা করি। যেই জায়গায় সেটা আটকে আছে, সেটা খুবই ডিপ সিটেভ। ওইখানে একসাথে অনেকগুলো রক্তনালী রয়েছে, যেটাকে আমরা সার্কেল অব উইলিস বলি। শুক্রবার যে অপারেশনটা করা হয়েছে, সেটা মূলত ব্রেনটাকে স্পেস দেওয়ার জন্য করা হয়েছে, যাতে চাপ কমে।
নিউরোসার্জন ডা. আব্দুল আহাদ শুক্রবার ঢাকা মেডিকেলে হাদির অপারেশনের অংশ নিয়েছিলেন। তিনি এনসিপির সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন।
এভারকেয়ারে হাদির চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়ে এসে আব্দুল আহাদ বলেন, ‘তার শারীরিক অবস্থা যেরকম আশঙ্কাজনক ছিল, সেটা অপরিবর্তিত রয়েছে। রোববার সকালে তার যে রিপিট সিটি স্ক্যান করা হয়েছে, সেখানেও ভালো কিছু পাওয়া যায়নি। তার ব্রেন স্টেমে যে ইনজুরিটা ছিল, সেটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তার মস্তিষ্কে যে অক্সিজেন স্বল্পতা ছিল সেটা আরও প্রকট হয়েছে। তাকে ছয় ব্যাগ ফ্রেশ বøাড ও পাঁচ ব্যাগ প্লাজমা দেওয়া হয়। অনেক রক্ত সঞ্চালনার কারণে ব্রেনের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে আছে বলে আমরা দেখেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, তার শারীরিক অবস্থা পরিবর্তিত রয়েছে। গত দুইদিন যেরকম আশঙ্কাজনক ছিল, সেরকমই রয়েছে। শুক্রবার তার যেরকম জিসিএস-৩ ছিল, এখনো সেটা অপরিবর্তিত রয়েছে।’
হাদির কিডনি কাজ করছে জানিয়ে চিকিৎসক আব্দুল আহাদ বলেন, ‘ব্রনের অপারেশনের আগে তার কিডনি ফাংশনিং ছিল না, সেটা এখন ফিরে এসেছে। তার নরমাল কিডনি ফাংশনিং চলছে। বাকি অর্গানগুলো ভেন্টিলেশন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে। তার পাল্স ও বিপি এখন স্টেবল আছে।’
হাদিকে গুলিকারী ‘খুবই পেশাদার’ মন্তব্য করে এ চিকিৎসক বলেন, ‘আমি একজন সার্জন হিসেবে বলতে চাই, খুব এক্সপার্ট হ্যান্ড এই কাজটা করেছে। তাকে ডান পাশ দিয়ে গুলি করা হয়েছে। সেটা টেম্পোরাল বোন ভেদ করে ব্রেনের যে মেইন অংশ ব্রেন স্টেমের মধ্য দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে। এক্সপার্ট হ্যান্ড ছাড়া এরকম সে যদি অভিজ্ঞ না হয়, তাহলে সে এই জায়গায দিয়ে গুলি করতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘শুক্রবার যখন আমরা তাকে ঢাকা মেডিকেলের ওসেকে রিসিভ করি, তখনই তার দুইটা কার্ডিয়াকরেস্ট হয়ে গিয়েছে। এরপর ৫ সাইকেল সিপিআর দেওয়ার পর সে কামব্যাক করে।’
মস্তিষ্কে ফোলা বেড়েছে: মেডিকেল বোর্ড
এদিকে সিটি স্ক্যান পরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাদির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড বলেছে, রবিবার তার মস্তিষ্কের ফোলা আগের তুলনায় বেড়েছে, যা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি’ নির্দেশ করে। ব্রেন স্টেমে আঘাত ও মস্তিষ্কের অতিরিক্ত ফোলাজনিত চাপের কারণে রোগীর রক্তচাপে ওঠানামা পরিলক্ষিত হচ্ছে। রবিবার রোগীর হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সাপোর্ট চলমান রয়েছে।
এক বিবৃতিতে বোর্ড বলেছে, রোগীর কিডনির কার্যক্ষমতা বর্তমানে বজায় আছে এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা আগের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে ব্রেন ইনজুরির কারণে শরীরের কিছু হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে, যা প্রতি ঘণ্টায় ইউরিন উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। এ কারণে এসিড-বেস ব্যালেন্স, ফ্লুইড ও ইলেক্ট্রোলাইট অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা করা হচ্ছে।
রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তক্ষরণের ভারসাম্যহীনতা বর্তমানে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে মেডিকেল বোর্ড। হাদির সার্বিক অবস্থা বর্তমানে ‘অত্যন্ত আশঙ্কাজনক’ উল্লেখ করে মেডিকেল বোর্ড বলছে, সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর নির্বাচনী প্রচারণা শেষে রিকশায় করে বাংলামোটরে ফেরার পথে মতিঝিলের কালভার্ট রোডের ৬৫/২/২, পুরানা পল্টনের ডিআর টাওয়ারের সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর গুরুতর আহত হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ মো. ওসমান হাদি (৩৩)।



