প্রথম দিনে ৬ পরীক্ষার্থী ও ১ পরিদর্শক বহিষ্কার, অনুপস্থিত ২৫ হাজার

২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের প্রথম পরীক্ষা গতকাল মঙ্গলবার সারাদেশে ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে প্রথম দিনে বাংলা প্রথম পত্র, মাদরাসা বোর্ডের অধীনে দাখিলে কোরআন মাজিদ ও তাজভিদ এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়া হয়।

পরীক্ষায় অংশ নেন সাড়ে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি জানিয়েছে, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সারাদেশে ৬ জন পরীক্ষার্থী এবং একজন পরিদর্শককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এদিন সব বোর্ড মিলিয়ে অনুপস্থিত ছিল ২৫ হাজার ৪০৮ জন।

এদিকে পরীক্ষা শেষে গতকাল সরকারি বিজ্ঞান উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বের হয়ে তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহনাজ রহমান বলেন, ‘প্রশ্নপত্র সহজ হয়েছে। সব প্রশ্নের উত্তর লিখে এসেছি। এত ভালো লিখেছি যে, নম্বর কাটার সুযোগও নেই। তারপরও বাংলা পরীক্ষা হওয়ায় হয়তো নম্বর কাটতে পারে। গণিত বা ইংরেজি হলে নম্বর কাটারও সুযোগ থাকতো না।’

আরেক শিক্ষার্থী অর্নব বলেন, ‘ভয়ে ছিলাম। আব্বু-আম্মুও ভয়ে ছিলেন। এবার পরীক্ষা কঠিন হবে। কী হয় না হয়! কিন্তু প্রশ্ন খুবই সহজ হয়েছে। সবার কমন পড়েছে। কমন প্রশ্ন আসায় কেউ দেখাদেখিও করেনি।’

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রকাশিত তথ্যমতে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বাংলা প্রথমপত্রে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৩ জন। পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১১ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। অনুপস্থিত ১১ হাজার ৮৯০ জন। এদিন দুইজন পরীক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছে, একজন ঢাকা বোর্ডে এবং একজন দিনাজপুর বোর্ডে।

অন্যদিকে মাদরাসা বোর্ডের অধীন দাখিলের কোরআন মজিদ ও তাজভিদ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯০৩ জন পরীক্ষার্থীর। তবে অংশ নিয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯২ জন। এতে অনুপস্থিত ১১ হাজার ২১১ জন। মাদরাসা বোর্ডে সারা দেশে চারজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি (ভোকেশনাল) ও এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষার প্রথম দিনে বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষায় ৬৫৩টি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ২৫০ জন। পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৪৩ জন।

অনুপস্থিত ২ হাজার ৩০৭ জন। কারিগরি বোর্ডে কোনো শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়নি; তবে একজন পরিদর্শককে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে গড় অনুপস্থিতি ১ দশমিক ০৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিতি বরিশাল বোর্ডে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সবচেয়ে কম অনুপস্থিতি দিনাজপুর বোর্ডে।

অন্যদিকে মাদরাসা বোর্ডে গড় অনুপস্থিতি ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
সাইবার মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করার চেষ্টা করলে তা প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে ঢাকা, সাভার ও মানিকগঞ্জ মিলিয়ে পাঁচটি কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষার সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, অত্যন্ত সুষ্ঠু ও আনন্দময় পরিবেশে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষার প্রথম দিনে ঢাকা বোর্ডের অধীনে থাকা পাঁচটি ‘ঝুকিপ‚র্ণ’ কেন্দ্র সাভারের তেঁতুলঝোড়া উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ উচ্চ বিদ্যালয় ও সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়, আমিনবাজারের মীরপুর মফিদ-ই-আম স্কুল এন্ড কলেজ এবং ঢাকার পাইকপাড়াস্থ মডেল একাডেমি পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে দেখেন।

এ সময় তিনি শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন। তিনি পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোয় স্থাপিত কন্ট্রোল রুম থেকে সিসি টিভি’র মাধ্যমে পরীক্ষার হলগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার্থীদের যেন কোন ধরনের ভোগান্তি না হয়, সেজন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে খোলার ব্যবস্থা করা হয়।

এছাড়া নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে কেন্দ্রগুলোতে সিসি টিভির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মন্ত্রী এ সময় শিক্ষার্থীদের নির্ভয়ে ও আনন্দের সাথে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পরামর্শ দেন। এছাড়া অভিভাবকদের পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশে অযথা ভীড় না করার অনুরোধ করেন। মন্ত্রী সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা আয়োজনের জন্য ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এক কেন্দ্রে একজনকে বহিষ্কার করেছি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন,‘প্রশ্নফাঁস করবে যারা তারা যে যন্ত্রটি ব্যবহার করে সেই যন্ত্রটিকে আবার কারেকশন করার লোকও রয়েছে। সাইবার ক্রাইম যেন আমার এই সেক্টরে না হয় এটা আমার অনেকদিন ধরে প‚র্বপ্রস্তুতি আমার ছিল এবং সাইবার ক্রাইম স্পেশালিস্টদেরকে আমি যারা যারা সংশ্লিষ্ট রয়েছে এই প্রশ্নপত্র এবং ম্যানেজমেন্টের সাথে তাদের সকলের নাম্বার আমি সাইবার ক্রাইম অথরিটির কাছে দিয়ে রেখেছিলাম। ইফ এনিথিং হ্যাপেনস তারা ইমিডিয়েটলি লোকেট করতে পারবে।

এবারই প্রথমবারের মত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করতে কেন্দ্র সচিবদের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কন্ট্রোল রুমে গিয়ে আমি সিসি ক্যামেরাগুলো দেখেছি এবং দেখলাম প্রত্যেকটি কন্ট্রোল রুমে সিসি ক্যামেরা রয়েছে এবং হেড এক্সামিনার কেন্দ্র সচিব তার কক্ষে বসেই রুমগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। আমি নির্দেশ দিয়েছি যে সিসি ফুটেজ আর্কাইভে রেখে দিবেন। পরে কোনো কমপ্লেইন আসলে আমরা যেন ভেরিফাই করতে পারি।’

তিনি বলেন, প্রশ্ন আউটের কোন সম্ভাবনা আদৌ নেই এবং হয়নি এবং এই ধরনের কোন আলোচনা নেই। নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদেরকে আমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরেই কারিকুলাম নিয়ে কাজ করার জন্য বলেছি। তারা কাজ করছে। সোমবার থেকে আমি ডিরেক্ট সুপারভিশন শুরু করেছি। এখন থেকে ননস্টপ কারিকুলামের উপর সুপারভিশনেই আমি কাজ করব সামনে কয়েক দিন দেখি কি করা যায়। করতেই হবে, এর কোন বিকল্প নেই।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এইচএসসি ও সমমনা পরীক্ষার রুটিন চলতি সপ্তাহেই তৈরি হবে। জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, পিএসসি-জেএসসি যে পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল সেটা স্টেকহোল্ডাররা-অংশীজনরা চায়নি বলেই লাস্ট গভমেন্ট বন্ধ করেছিলেন। যারা শুরু করেছিলেন তারাই বন্ধ করেছিলেন।

অতএব এটা যেহেতু অলরেডি টেস্টেড মেথড। অতএব এটাকে আমরা আবার রিভাইটালাইজ করব বলে আমি আশা করি না। কারণ ইট ইজ অলরেডি টেস্টেড। আমাদের সময় আমরা দেখেছি, আমরা আনন্দও করেছি ভয়ও পেয়েছি। এই জায়গাতে আপাতত থাকুক।

পরীক্ষার্থীরা উৎসাহ-উদ্দীপনায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে: শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। মঙ্গলবার সকালে তিনি রাজধানীর তিনটি পরীক্ষার কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। দুপুরের দিকে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা জানান।

ফেসবুক পোস্টে মাহদী আমিন লেখেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সকালেই পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনে ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাই স্কুল, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। দেখেছি, শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করছেন।

পরীক্ষার্থীরাও প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। ফলাফল যাই হোক, আসুন, সবাই আমাদের এই সন্তানদের সহানুভ‚তি ও প্রেরণা নিয়ে ম‚ল্যায়ন করি। কারণ, আগামীর বাংলাদেশের ম‚ল কারিগর তো তারাই।’

পরীক্ষা আইন অমান্য করে এসএসসি কেন্দ্রে এমপি সেলিম ভুইয়া, ফেসবুকে লাইভ: পরীক্ষা সংক্রান্ত আইন এবং শিক্ষামন্ত্রীর অনুরোধ অমান্য করে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে গিয়ে হলের ভেতর থেকে ফেসবুকে লাইভ করেছেন কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য আইনজীবী মো. সেলিম ভ‚ইয়া। মঙ্গলবার সকালে হোমনা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে যান সংসদ সদস্য সেলিম ভ‚ইয়া। এ সময় তার ‘অধ্যক্ষ সেলিম ভ‚ইয়া এমপি’ ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ করা হয়। সংসদ সদস্য হলফনামায় নিজের পরিচয় আইনজীবী।

সেলিম ভ‚ইয়া বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনের সমিতির চেয়ারম্যান। বহু বছর আগে তিনি অবসরে গেছেন। ওই ফেসবুক লাইভে দেখা গেছে, আইনজীবী সেলিম ভ‚ইয়া হোমনা সরকারি কলেজের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছেন। পরে পরীক্ষার হলের একটি কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক এবং পরীক্ষার্থীদের অঙ্গভঙ্গিতে নির্দেশনা দিচ্ছেন। সেখান থেকে বেরিয়ে সামনের কক্ষের দিকে যাচ্ছেন।

এসময় ক্যামেরার পেছনে থাকা অপর এক বহিরাগত সঙ্গী সংসদ সদস্যের পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনের বর্ণনা করছেন। পরের কক্ষে সংসদ সদস্য সেলিম ভ‚ইয়া প্রবেশ করে সামনের বেঞ্চে বসা এক শিক্ষার্থীর কাছে চলে যান। এসময় সেলিম ভ‚ইয়াকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়- পরীক্ষা সহজ হইছে নাকি?

কিছুক্ষণ পর সেই কক্ষ থেকে বের হয়ে অন্য একটি কক্ষের দিকে যেতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক এসে সালাম দিয়ে ‘আমি প্রধান শিক্ষক’ বলেন। এসময় সংসদ সদস্য সেলিম ভ‚ইয়া তাকে ‘আপনি আপনার কাজ করেন’ বলে তাকে চলে যেতে হাতে ইশারা দিতে দেখা যায়।

কিছুক্ষণ পর আরেকটি কক্ষে প্রবেশ করে সোজা কক্ষের মাঝ বরাবর চলে যান। সেখানে পরীক্ষারত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেমন হয়েছে বলে প্রশ্ন করেন। এভাবে ৮ মিনিট ৫৭ সেকেন্ড লাইভে সংযুক্ত থাকতে দেখা গেছে সংসদ সদস্য সেলিম ভ‚ইয়াকে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments