খবরের কণ্ঠ ডেস্ক
নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ৮৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের জাতীয় পটপরিবর্তনের অস্থিরতা থেকে বহুদূরে শান্ত অবসরজীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এখন দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার দৃষ্টিতে এটি উচ্চাকাক্সক্ষা নয় বরং অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। এটা (সরকারপ্রধানের পদে বসা) কখনোই তার নিজের জন্য নয়; বরং দেশের জনগণের জন্য। মালয়েশিয়ার সংবাদ সংস্থা বারনামাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরকালে বারনামাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এটা আমার নয়, এটা সেসব মানুষের চাওয়া, যারা পরিবর্তন চেয়েছিলেন। তারা যেভাবে চলতে চান, আমি শুধু তাদের সেভাবে চলতে সহায়তা করছি। আমি নিজের থেকে কিছু চাপিয়ে দেই না। আমি কেবল জনগণের ইচ্ছা কী তা দেখার জন্য অপেক্ষা করি এবং তারপর আমি এটিকে সহজতর করি।
২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়া একজন ব্যক্তি হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে যাওয়াটা কখনোই অধ্যাপক ইউনূসের পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তার ভাষায়, পরিস্থিতি তাকে পছন্দ বেছে নেওয়ার বিষয়ে খুব কমই সুযোগ দিয়েছে। একজন নেতার চেয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একজন অভিভাবক হিসেবেই বর্তমানে নিজের ভূমিকা তুলে ধরতে চান তিনি। এক্ষেত্রে সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেন।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এখানে অনেক সমস্যাও আছে। অনেকেই এটাকে ব্যাহত করতে চায়। যেমন বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত রাজনৈতিক উপাদানগুলো পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত দেড় দশকে প্রাপ্তবয়স্ক অনেকে নতুন ভোটার হয়েছেন, যাদের কেউ আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এখানে কেউ ১০ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। আবার কেউ ১৫ বছর। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একবার ভেবে দেখুন, আপনার ১৮ বছর বয়স হয়েছে, আপনি ভোট দিতে আগ্রহী। কিন্তু আপনি সেই সুযোগ কখনো পাননি। কারণ, সত্যিকার অর্থে কখনো নির্বাচনই হয়নি। এখন তারা ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার ভোট দিতে পারবেন। তার কথায়, জাতীয় পরিবর্তনের প্রত্যাশার আলো ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ড. ইউনূসের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে গত শুক্রবার বারনামার প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার বা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো আগ্রহ নেই- এ বিষয়টি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, রাজনীতিতে যোগদানের কোনও সম্ভাবনা নেই, আমি সেই ব্যক্তিও নই। এ সময় তিনি বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় তার উপর অর্পিত দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশ এখন সঠিক পথে ফিরেছে। আমরা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য এখন প্রস্তুত। তিনি বলেন, বহু বছরের মধ্যে এটিই হবে প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, কারণ শেখ হাসিনার অধীনে আগের তিনটি নির্বাচন জালিয়াতি, বিতর্ক এবং ভোটারদের দমনের অভিযোগে জর্জরিত ছিল।
বারনামার অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার জন্য মালয়েশিয়ার প্রভাব, বিশেষ করে দেশটির আসিয়ান চেয়ারের ভূমিকা কাজে লাগাতে চাইছে বাংলাদেশ। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও আসিয়ানে নেতৃত্বপূর্ণ অবস্থান একযোগে দেশটিকে একটি অনন্য অবস্থান দিয়েছে। বিষয়টি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক (সমস্যা) সমাধানে পদক্ষেপ নিতে সহায়ক হতে পারে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গত ১৮ মাসেই নতুন করে দেড় লাখ রোহিঙ্গা দেশে এসেছেন। এরই মধ্যে দেশে থাকা ১২ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তারা। এ সমস্যা ক্রমেই জটিল হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- যুক্তরাষ্ট্র তাদের (রোহিঙ্গা) সব তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে।



