ডিবির সাবেক প্রধান হারুনসহ ১৮পুলিশ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন রশীদসহ ১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের (পুলিশ-১ শাখা) প্রজ্ঞাপন থেকে এ তথ্য জানা যায়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে সই করেছেন সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি।
এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত সব পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতকাল সোমবার ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের (এনএলসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু এ নোটিশ পাঠিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই ১৮ পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাই তাঁরা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ‘পলায়ন’-এর শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন। এ কারণে প্রজ্ঞাপনে তাদের নামের পাশে উল্লিখিত তারিখ হতে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরখাস্তকালীন তারা খোরপোশ ভাতা প্রাপ্য হবেন। জনস্বার্থে এই আদেশ জারি করা হলো।
হারুন ছাড়া বরখাস্ত বাকি ১৭ কর্মকর্তা হলেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সঞ্জিত কুমার রায়, অতিরিক্ত ডিআইজি রিফাত রহমান শামীম, ডিএমপির সাবেক উপ-কমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসান আরাফাত, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, খাগড়াছড়ি এপিবিএনের বিশেষায়িতি ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকা।
এছাড়া কক্সবাজার এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস, ঢাকা পুলিশ স্টাফ কলেজের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিন, ঢাকা পুলিশ স্টাফ কলেজের সহকারী পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ দালাল, বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশানার রাশেদুল ইসলাম, ঢাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, আরএমপির সাবেক উপ-কমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন ও ডিআইজি কমান্ড্যান্ট মহা. আশরাফুজ্জামানও বরখাস্ত হয়েছেন।
সাময়িক বরখাস্তে লিগ্যাল নোটিশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত সব পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতকাল সোমবার ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের (এনএলসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু এ নোটিশ পাঠিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর এ নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এজাহারভুক্ত সকল পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ চাওয়া হয়েছে।
আইনজীবী এস এম জুলফিকার আলী জুনু জানিয়েছেন, যদি এ বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে আমি বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হবো।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনায় সারা দেশে ৭৬১টি মামলা করা হয়েছে। মামলায় পুলিশের ১ হাজার ১৬৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি ৭, অতিরিক্ত আইজিপি ৪১, সাবেক ডিআইজি ১২ ও ১১ জন বর্তমান ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ৪৯, পুলিশ সুপার (এসপি) ৬৬, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ৬৫, সহকারী পুলিশ সুপার ৩৫, পরিদর্শক ১৮৭, উপপরিদর্শক (এসআই) ৩৪০, এএসআই ১১৭ ও কনস্টেবল ২২৪ জন। বাকিরা টিএসআই, এটিএসআই ও নায়েক পদের পুলিশ সদস্য।
গতকাল পাঠানো লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্ট মাসের নৃশংস ঘটনায় দায়েরকৃত প্রায় সাত শতাধিক হত্যা মামলায় বহু পুলিশ অফিসার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আইনের মৌলিক নীতি হলো-কোনো মামলার এজাহারভুক্ত আসামি যদি দায়িত্বশীল পদে বহাল থাকেন, তবে মামলার তদন্ত কার্যক্রম, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার সুস্পষ্ট আশঙ্কা থাকে। উক্ত আসামিরা বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বশীল পদে বহাল থাকায় তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তাদের চাকরিতে বহাল থাকা অনুচিত ও অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের তদন্ত চলাকালীন অবস্থায় তাকে জনস্বার্থে সাময়িক বরখাস্ত করা যেতে পারে। পুলিশ রেগুলেশনে বলা আছে, যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ আনা হয় বা মামলা দায়ের হয়, তবে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনবোধে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে পারে। আইন অনুযায়ী পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এজাহারভুক্ত পুলিশ অফিসারদের পদে বহাল রাখা আইন, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের পরিপন্থী। তাই অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments