আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিপেটায় আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি ভালো আছেন। তবে তার শরীরে চারটি সমস্যা ধরা পড়ার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নুরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবি জানিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেছেন, দেশে চিকিৎসা হলে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এবং জীবনে ঝুঁকি আসতে পারে। অন্যদিকে শুক্রবারের সংঘাতের পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির (জাপা) কার্যালয়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরায় জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসভবনের সামনেও পুলিশ পাহাড়া রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান গতকাল রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন উনি ভালো আছেন। তবে একটু যেটা হয়, এ ধরনের একটা ট্রমা, এ ধরনের ফ্র্যাকচার হয়েছে কিছু, সেজন্য উনার কিছু ব্যথার কমপ্লেইন আছে।’ শুক্রবার রাত ১১টার সময় নুরকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় জানিয়ে পরিচালক আসাদুজ্জামন বলেন, প্রথমে উনাকে আমরা ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নিয়ে যাই। ইনিশিয়ালি অ্যাসেসমেন্ট করার পরে তাকে আমরা আইসিউইতে শিফট করি। ওইদিন রাতেই আমরা একটা মেডিকেল বোর্ড গঠন করি।ছয় সদস্যের মেডিকেল বোর্ডে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, নিউরো সার্জন, আইসিইউর প্রধান আছেন বলে জানান তিনি।
ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক বলেন, সকল বিভাগের প্রধানরা ওইদিন রাতে এবং আমি নিজে উপস্থিত থেকে এই বোর্ডটা পরিচালনা করি। ওখানে তার অ্যাসেসমেন্ট হয় এবং পরবর্তী ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হয়।উনি আগে যে হাসপাতালে ছিলেন, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে একটা সিটিস্ক্যান করেছিলেন। পরদিন সকালে আমরা আবার একটা সিটি স্ক্যান করি।নুরকে আইসিইউতে রেখেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, নুর বর্তমানে ‘স্ট্যাবল’ আছেন এবং কথাবার্তা বলছেন, ‘লিক্যুইড ডায়েট’ খেতে পারছেন।
নুরের চারটি শারীরিক সমস্যা ধরা পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটা হচ্ছে উনার নাকের হাড় ভেঙে গিয়েছিল, ম্যাক্সিলা- যেটা মুখের একটা হাড়ে ক্র্যাক আছে। আর চোখে একটু ইনজুরি, যেটা আমরা সাবকনজাংটিভাল হেমারেজ বলি- সেখানে ডান চোখের এরকম হেমারেজ আছে।আর যেটা নিয়ে আমরা একটু কনসার্ন, সেটা হচ্ছে উনার কিছু ইন্ট্রাক্রেনিয়াল হেমারেজ ছিল। যদিও খুব বেশি না। এটা খুব অল্প পরিমাণে ছিল। আমাদের সিটিস্ক্যান পরবর্তীতে করেছি, আমরা দেখেছি এটা রিজলভ হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে এখন উনি ভালো আছেন, একটু ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, এটাই উনি আজকে আমাকে বলেছেন।
নুরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রাশেদের :গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। দেশে চিকিৎসা হলে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এবং তার জীবনে ঝুঁকি আসতে পারে বলে সন্দেহ করছেন রাশেদ খান। গতকাল বেলা একটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান রাশেদ খান।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নুরুল হকের ওপর লাঠিপেটার ঘটনায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) দেওয়া বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান তিনি।
রাশেদ খান বলেন, নুর এখনো কাতরাচ্ছেন। আমরা সন্দেহ করছি, বাংলাদেশে তার যে ধরনের চিকিৎসা দরকার, সেটা সম্ভব নয়। যেহেতু হাসিনার আমলে নুর ২২ বার হামলার শিকার হয়েছেন, তার পুরো দেহ ক্ষতবিক্ষত। সুতরাং এই মুহূর্তে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা মনে করি সিঙ্গাপুর অথবা ইউকেতে নিতে হবে।
রাশেদ খান বলেন, আমরা মনে করছি, বাংলাদেশে যেসব চিকিৎসক রয়েছেন, তারা অবশ্যই দক্ষ। আর অবশ্যই উন্নত চিকিৎসা দিতে পারেন। কিন্তু নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। আমরা সন্দেহ করছি, এখানে চিকিৎসা হলে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এবং তার জীবনের ক্ষেত্রে একধরনের ঝুঁকি নেমে আসতে পারে। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে যে ইনজেকশন পুশ করে একজন জাতীয় ও জনপ্রিয় নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
রাশেদ খান বলেন, শনিবার সরকারের পক্ষ থেকে নুরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আজকেও নুরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।সরকারের কাছে তদন্ত কমিটি গঠন করার আহ্বান জানান রাশেদ খান। সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করবে বললেও সেটি করবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে রাজধানীর ডিআরইউ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় রাশেদ খান বলেন, নুরের ওপর হামলার ঘটনায় পুরো সেনাবাহিনীর দায় নেই। বাহিনীর কতিপয় সদস্য অতি উৎসাহী হয়ে এ হামলা চালান। এতে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যেসব সদস্য হামলা চালিয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর ফলে এই দুই বাহিনীর ওপর দায় আসবে না। আমরা চাই না, এই দুই বাহিনীকে মানুষ ভুল বুঝুক। কারণ, তাদের নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে।স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা ও গণ অধিকার পরিষদের ওপর হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে রাশেদ খান বলেন, আমরা দেখতে চাই, সরকার আমাদের জন্য কী করে।
গত ৮ বছরেও এত জঘন্য হামলা হয়নি: নুরের স্ত্রী :ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরের স্ত্রী মারিয়া নুর বলেছেন, গত ৮ বছরেও আমার স্বামীর ওপর এত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক হামলা হয়নি।তিনি অভিযোগ করে বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময় নুরের ওপর হামলা হয়েছে। তবে বর্তমানে ‘ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশে’ প্রশাসনের এ ধরনের হামলা কল্পনাতীত। গতকাল দুপুরে স্বামী নুরুল হক নুরকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মারিয়া নুর বলেন, আমার লাইফটা সম্পূর্ণ আলাদা। তারপরও মিডিয়ার সামনে আসতে বাধ্য হলাম। ৩০ তারিখ ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি লাইভ দেখছিলাম। আমি কখনো কল্পনা করতে পারিনি। স্তব্ধ হয়ে গেছি। কিছু বর্ণনা করার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।ডাকসু নির্বাচনে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ছাত্রলীগ-যুবলীগদের দ্বারা তার ওপর হামলা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনের এ সময়ে এসে এমন হামলা আমার কাছে কল্পনাতীত। গত ৮ বছরে ফ্যাসিস্ট আমলেও এতটা ন্যক্কারজনক হামলা হয়নি।
মারিয়া নুর বলেন, আমার স্বামীর শারীরিক অবস্থা এখনো ভালো নয়। তাকে শারীরিকভাবে এত আঘাত করা হয়েছে- ব্রেন, নাক, চোয়ালে আঘাত পেয়েছেন। ভেতর থেকে মেরুদণ্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় আঘাত লেগেছে। ডাক্তাররা বলছিলেন, ৩৬ ঘণ্টা অবজারভেশনের পর কিছু বলা যাবে। তার জ্ঞান ফিরেছে, কিন্তু শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। এখনো ডাক্তাররা বলছেন, ৭২ ঘণ্টা না গেলে কিছু বলা সম্ভব নয়। তার মানে তিনি এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়।
নুরকে প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানো হবে : শারমীন মুরশিদ :মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেছেন, নুরুল হক নুরের ওপর সম্প্রতি যে অমানবিক হামলা হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, নুরুল হক নুরসহ আহতদেরকে উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে প্রয়োজনে বিদেশ পাঠানো হবে। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং তার দলের অন্যান্য আহত সদস্যের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে গিয়ে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।



