সুরক্ষার ঢাল ম্যানগ্রোভ বন

জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এবং নিচু ভূমি হওয়ায় এই ঝুঁকি দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বিপদ মোকাবিলায় কংক্রিট বাঁধ বা কৃত্তিম অবকাঠামো ছাড়াও প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি বিশ^ ব্যাংক গ্রুপের প্রকাশিত ‘আরবান, ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, রিসেলিয়্যান্স অ্যান্ড গ্লোবাল ডিপার্টমেন্ট’ এর “বাংলাদেশে উপকূলীয় স্থিতিস্থাপকতায় ম্যানগ্রোভ” শীর্ষক এক গবেষণায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ম্যানগ্রোভ বনের ঘন এবং জটিল শিকড় ব্যবস্থা একটি প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করে। এটি ঝড়ের ঢেউয়ের গতি কমিয়ে দেয় এবং ঢেউয়ের শক্তি শোষণ করে নেয়। ৫০০ মিটার প্রশস্ত ম্যানগ্রোভ বন ঢেউয়ের গতি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বনে ঢেউয়ের উচ্চতা ১০০ মিটার দূরত্বে ৫ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। যা উপকূলীয় বাঁধের সুরক্ষায় চাপ কমানোর পাশাপাশি বাঁধের ঢাল রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্লক বা পাথরের আকার ১৩ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে- ম্যানগ্রোভ বন যেমন পরিবেশগত সুরক্ষা দেয় একই সঙ্গে এটি স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অবদানেও ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাছ প্রজনন হয় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে। এখানে মাছ, মধু এবং কাঠ সংগ্রহ করে হেক্টর প্রতি আয়ের পরিমান ২২ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি। এছাড়া ২০১৪-২০১৫ সালে সুন্দরবন থেকে পর্যটন খাতে আয় ছিলো প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ মার্কিন ডলার।
গবেষণার তথ্যমতে, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার করতে হেক্টর প্রতি ব্যয় হবে প্রায় ৭ হাজার ৪৬৭ থেকে ৭ হাজার ৭৮১ মার্কিন ডলার। আর বিপরীতে আয় হবে হেক্টর প্রতি ২২ হাজার থেকে ৩০ হাজার ৩৩০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত। এছাড়া কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিকসহ বহুমুখী সুবিধায় অবদান রাখতে পারে।
গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনে ম্যানগ্রোভের ভূমিকা তুলে ধরে বলা হয়েছে- এই বনগুলো বায়ুম-ল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে মাটি ও বায়োমাসে জমা করে। এতে হেক্টর প্রতি ম্যানগ্রোভ বন ১৪ টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। গবেষণার আরো বলা হয়, ২০৫০ সাল পর্যন্ত হেক্টর প্রতি ম্যানগ্রোভ বনের ১৩ হাজার ১২০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ কার্বন সেবার সুবিধা দিতে পারে। ভবিষতে এর মূল্য আরো বাড়বে বলেও।
উল্লেখ্য, দেশে ১৯৬০-এর দশক থেকে উপকূলীয় সুরক্ষার জন্য ম্যানগ্রোভ লাগানো হচ্ছে। তবে, এতদিন বাঁধের নকশা করার সময় ম্যানগ্রোভের সুরক্ষামূলক প্রভাবগুলোকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে যেখানে ম্যানগ্রোভ আছে, সেখানেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে উঁচু এবং শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
গবেষণায় খরচ এবং সুবিধার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ম্যানগ্রোভের কারণে বাঁধের ঢাল রক্ষার জন্য ব্যবহৃত নির্মাণ সামগ্রীর পরিমাণ ও পুরুত্ব কমে যাওয়ায় বাঁধ নির্মাণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ভিয়েতনামে একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১০০ থেকে ৯০০ হেক্টর আয়তনের ম্যানগ্রোভ বন বাঁধের মেরামত খরচ বাবদ হেক্টর প্রতি ৩২৭ থেকে ৮০০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় করতে পারে। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বন বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। ভিয়েতনামের উদাহরণে, ম্যানগ্রোভের কারণে বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য হেক্টর প্রতি ৮১০ থেকে ১৫ হাজার ৭৩৮ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ধরা হয়েছে। যেসব স্থানে জনসংখ্যা বেশি, সেখানে এই সুবিধা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলেও গবেষণায় বলা হয়েছে।
তথ্যমতে, বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন প্রধান। সুন্দরবনে ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ২০১৯ সালে সুন্দরবনে প্রতি হেক্টরে গাছের ঘনত্ব ছিল সাত হাজার ৩৪৫টি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫৫৩টিতে। ফলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে সুন্দরবনে গাছের ঘনত্ব বেড়েছে ২০৮টি। বাঘের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার বাঘ যেসব প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে সেগুলোর পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বে প্রায় ৪৮ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বা শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ রয়েছে। যার ৩৫ প্রজাতি রয়েছে সুন্দরবনে। এ ছাড়া কক্সবাজারে মাতামুহুরী নদীর মোহনায় ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে, যা ‘চকোরিয়া সুন্দরবন’ নামে পরিচিত। টেকনাফের কাছাকাছি নাফ নদের তীরেও একটি ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। টেকনাফ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণাংশে একটি ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। উপকূলের প্রতিকূল ও লবণাক্ত মাটিতে গরান, বাইন ও কেওড়াগাছ ভালো জন্মায়। এ অঞ্চলে এসব গাছের চারা রোপণ করে কৃত্রিমভাবে ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৯টি উপকূলীয় জেলায় প্রায় ৬২ হাজার ২৫৫ হেক্টর চরে ম্যানগ্রোভ বনায়ন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের ম্যানগ্রোভ বনের মোট আয়তন ১০ হাজার ২৮০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ ভারতের পশ্চিবঙ্গে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ কমিয়ে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা কমিয়ে আনছে সুন্দরবন। ১৮৭৭ সাল থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ৪৮ বার তীব্র ঘূর্ণিঝড় এবং ৪৯ বার ঘূর্ণিঝড় এবং ২০ বার হারিকেন হয়েছে। এ ছাড়া ছোট-বড় নানা ধরনের জলোচ্ছ্বাস তো আছেই। সব মিলিয়ে প্রতি তিন বছর পর পর দেশে বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments