জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহবায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাইয়ের পুরো আন্দোলনের সময় জুড়ে আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। আওয়ামী লীগ ও তার অংগ সংগঠনের সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালায় ও নির্যাতন করে। আন্দোলনকারীদের ব্লক রেইড দিয়ে গণ গ্রেফতার ও গুম করা হয়। আহতের চিকিৎসা প্রদানে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। শহীদদের দাফনে বাধা দেওয়া হয়। লাশ গুম করা হয় ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, এ সকল ঘটনার জন্য শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ্জুামান খান কামাল, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের এবং যারা হত্যাকান্ড ও নির্যাতনে অংশগ্রহণ করেছে তাদের দায়ী করছি। যেহেতু শেখ হাসিনা সরকার প্রধান ছিলেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান ছিলেন সেহেতু তাদের নির্দেশেই হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তারা ক্ষমতা পাকাপোক্ত ও নিরঙ্কুশ করতেই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। বৃহস্পতিবার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ সাক্ষ্য দেন নাহিদ ইসলাম। বিচারপতি মো. গোলাম মুর্তজা মজুমদারের নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি গ্রহন করেন।
জবানবন্দিতে নাহিদ ইসলাম বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট ঢাকাসহ সারাদেশে আমাদের বহুসংখ্যক আন্দোলনকারী ছাত্রজনতা শহীদ ও আহত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার ও লেখাল উইপেন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতা বন্ধের জন্য সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্ট প্রধানগণ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই। এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যারা দায়ী তাদের কঠোর শাস্তি চাই। যাতে ভিকটিমরা ন্যায় বিচার পায়।
জবানবন্দিতে জুলাই গণআন্দোলনের নানা দিকের বর্ণণা দেন নাহিদ ইসলাম। তিনিসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে আটকে রাখা ও নির্যাতন, আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য ডিজিএফআই কর্তৃক চাপ প্রদান, মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচী ঘোষণা, নতুন সরকার গঠনের বিষয় নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি উঠে এসেছে জবানবন্দিতে। জবানবন্দি রেকর্ডে সহায়তা করেন চিফ প্রসিকিউটর এম. তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মো. মিজানুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের উদ্দেশ্যে জানতে পেরেই
এগিয়ে আনা হয় মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচী
তিনি বলেন, ৪ আগস্ট শাহবাগে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করি। ওইদিন ৬ আগস্ট “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচী ঘোষণা করি। আমরা জানতে পারি যে, ৬ তারিখ মার্চ টু ঢাকা কমসূচী ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। আরো জানতে পারি যে, সরকার মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দিবে। আমাদেরকে হত্যা বা গুম করা হতে পারে। তাই আমরা আমাদের “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচী এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করি। “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচী সফল করার উদ্দেশ্যে সমন্বয়কদের পক্ষে মাহফুজ আলম অন্যান্য ছাত্রসংঠন এবং নাগরিক সমাজের সাথে লিয়াজো করছিলেন। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আমরা নতুন সরকার গঠনের জন্য ড. ইউনুস স্যারের সাথে আলোচনা করি। তাঁকে নতুন সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দেই।
‘ডিজিএফআই চাপ দেয় আন্দোলন প্রত্যাহারের’
তিনি বলেন, ২২ জুলাই ডিজিএফআই অফিসার লে. কর্নেল সারোয়ার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে আমার রুমে জোরপূর্বক প্রবেশ করে আন্দোলন স্থগিত করার চাপ দেয়। পরদিন ডিজিএফআই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন সমাপ্তির ঘোষণা দিতে চাপ থাকলেও আমি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেই। ডিজিএফআই আমাকে বলতে বলে যে, বিএনপি-জামাত এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে নাশকতা করছে, কিন্তু আমি তা বলিনি। তিনি বলেন, ২৬ জুলাই দুপুরের দিকে ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি হাসপাতালে এসে আসিফ, বাকের ও আমাকে একটি মাইক্রোতে করে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে ডিবি প্রধান হারুন আমাদেরকে আন্দোলন স্থগিত করতে বলে। আমরা প্রথমে রাজি হইনি। পরদিন সমন্বয়ক হাসনাত ও সারজিসসহ অন্য সমন্বয়কদের আনা হয়। ডিবি জানায়, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমাদেরকে তুলে আনা, আটক রাখা ও নির্যাতন করা হয়েছে। এক পর্যায়ে ডিবি প্রধান হারুন আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
ছাত্রদল-ছাত্রশিবির-বামপন্থি কয়েকটি
ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে
সরকার পতনের ডাক দেই
নাহিদ ইসলাম বলেন, পহেলা আগস্ট একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আমরা ৬ জন সমন্বয়ক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেই। সমন্বয়ক ও অন্যান্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র সংগঠন যেমন, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং বামপন্থি কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সাথে আলোচনা করে ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করি।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট সারাদেশের মানুষ ঢাকায় আসতে থাকে। আমরা শাহবাগে অবস্থান গ্রহণের চেষ্টা করি। শহীদ মিনার ও চানখারপুল এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানো হয়। সেনাবাহিনী এক পর্যায়ে রাস্তা ছেড়ে দিলে আমরা শাহবাগে অবস্থান গ্রহণ করি। কিছুক্ষণের মধ্যে শাহবাগ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে আমরা গণভবনের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। পথিমধ্যে সংবাদ পাই যে, গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে গেছে। সন্ধ্যায় আমরা সংবাদ সম্মেলন করে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠনের এবং সকল রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি জানাই। আমরা কোন ধরণের সেনা শাসন বা সেনা সমর্থিত শাসন মেনে নিবো না বলে ঘোষণা দেই।
জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন পলাতক শেখ হাসিনা ও একেএম আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি আমির হোসেন।



