রায়েরবাজারে বেওয়ারিশ ১১৪ মরদেহ, আদালতের নির্দেশেও উত্তোলন হয়নি

জুলাই-আগষ্ট আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে ১১৪ টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসাবে রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। এক বছর ধরে মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় চলতি বছরের ৪ আগষ্ট ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালত ১১৪ টি মরদেহ উত্তোলনের নির্দেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশের ৪৭ দিন পরও মরদেহ উত্তোলন করা হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ গতকাল বলেন, মেট্রোপলিটন এলাকায় লাশ উত্তোলনের বিষয়টি আইনগতভাবে দেখেন পুলিশ কমিশনার। পুলিশই লাশ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ প্রোফাইল করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং এ সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রম শুরু করার বিষয়গুলো দেখে। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে লাশ উত্তোলনের সময় একজন ম্যাজিষ্ট্রেটের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়। সে ক্ষেত্রে আমরা একজন ম্যাজিষ্ট্রেট পাঠানোর নির্দেশনা দিয়ে রেখেছি। যতদূর জানি, পুলিশ কমিশনারের দপ্তর থেকে লাশ উত্তোলন সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসেনি।
আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিতকরণের পর পরিবারের কাছে শহীদদের লাশ হস্তান্তরের জন্য আদালতে লাশ উত্তোলনের আবেদন করেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. মাহিদুল ইসলাম। আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৪ই আগস্ট ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাাফিজুর রহমানের আদালত রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে বেওয়ারিশভাবে দাফন করা ১১৪টি লাশ তোলার নির্দেশ দেন।
গতকাল এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি কাজী রফিক বলেন, বিষয়টি যিনি আদালতে আবেদন করেছেন, তিনিই দেখভাল করছেন।
এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাহিদুল ইসলাম গতকাল বলেন, আদালত নির্দেশনা অনুযায়ি একজন ম্যাজিষ্ট্রেট চেয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আবেদন পুলিশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগের কোনো নির্দেশনা পুলিশের কাছে আসেনি। নির্দেশনা এলেই আমরা লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত ও সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের মাধ্যমে ডিএনএ প্রোফাইল প্রস্তুত করা হবে।
রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায়, কবরস্থানের বামপাশ দিয়ে এগিয়ে গেলে ৪ নম্বর ব্লকের ৩৭ নম্বর লেনে সারিবদ্ধভাবে দাফন করা রয়েছে জুলাই আন্দোলনে নিহত ১১৪ জনের লাশ। দাফন করা এসব কবরের পুরো জায়গা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাকা দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। দেয়ালের কালো টাইলসের ওপর নামফলকে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪-এর শহীদদের গণকবর’। এ ছাড়াও পুরো দেয়াল জুড়ে বিভিন্ন সূরা লেখা হয়েছে।
কবরগুলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা ও গোরখোদকেরা বলেন, বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের এই ৪ নম্বর ব্লকে সাধারণত বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে নাম-পরিচয়হীনভাবে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশগুলো প্রশাসনের মাধ্যমে দাফন করা হতো। গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময়ও যাদের পরিচয় শনাক্ত সম্ভব হয়নি তাদের এখানে দাফন করা হয়। অন্যান্য কবরে যেমন নামফলকে নাম-পরিচয় উল্লেখ থাকে কিন্তু এই কবরগুলোতে তা নেই। আন্দোলনের সময় একের পর এক লাশ এসেছে আর আমরা মাটি দিয়েছি। বছরখানেক তো খালি অবস্থাতেই ছিল এই কবরগুলো। সম্প্রতি উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পুরো জায়গায় পাকা দেয়াল করে দেয়া হয়েছে। তাই ডিএনএ প্রোফাইলের মাধ্যমে কারোর লাশ শনাক্ত করা গেলেও নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় কাকে ঠিক কোন জায়গায় কবর দেয়া হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বলছে, জুলাইয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন মর্গ থেকে নাম-পরিচয়হীন মোট ৮০টি লাশ পুলিশের মাধ্যমে দাফনের জন্য আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর আগস্টে আরও ৩৪টি লাশ হস্তান্তর করা হয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে লাশগুলো পর্যায়ক্রমে দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। সবশেষ গত ৭ই আগস্ট একজন নারীসহ ৬ জন জুলাইযোদ্ধার লাশ এক বছর ঢাকা মেডিকেলের মর্গে রাখার পর হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমানের কাছে। তাদেরকেও বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে জুরাইন কবরস্থানে।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহত যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম বলেন, গত বছরের ১৮ই জুলাই আন্দোলনে গিয়ে নিখোঁজ হন তার ছেলে সোহেল রানা। অনেক খোঁজ করার পরও সোহেলের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি ভিডিও দেখে বুঝতে পারি- ওইটা সোহেলের লাশ। এর ৩৪ দিন পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহের নথির মধ্যে সোহেলের ছবি খুঁজে পাই। সেখান থেকে জানতে পারি রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে আমার সন্তানকে দাফন করা হয়েছে। এরপর থেকে অনেকবার রায়েরবাজার কবরস্থানে এসেছি কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি ঠিক কোনটা আমার ছেলের কবর।
বিষয়টি নিয়ে জুলাই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক সোহেল মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাশ উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে গত সপ্তাহে একটি বৈঠক হয়েছে। আগামী সপ্তাহে একটি বৈঠক রয়েছে। আশাকরি বৈঠকে লাশ কবে উত্তোলন করা হবে-এ ব্যাপারে চুড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারণ হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments