রাকসু’র ভোট হবে ১৬ অক্টোবর

অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন পিছিয়ে আগামী ১৬ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা হিসেবে পোষ্যকোটায় ভর্তি বন্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হাতে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সহ কয়েকজন শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদ ও জড়িতদের বহিষ্কারের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ বিশ^বিদ্যালয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার মধ্যে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকালে এক জরুরী সভায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন-২০২৫ এর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. এফ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার রাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অদ্য ২২.০৯.২০২৫ তারিখ রাকসু নির্বাচন কমিশন-২০২৫ এর জরুরী সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত নি¤œরূপ : অদ্যকার রাকসু নির্বাচন কমিশন-২০২৫ এর পূর্ণাঙ্গ সভায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনপূর্ব উদ্ভূত পরিস্থিতি সার্বিকভাবে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। এ সভা লক্ষ্য করে যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান পরিস্থিতি কোনো অবস্থাতেই রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূলে নয়। কারণ, (১). রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। (২). নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়নি। উপর্যুক্ত বিবেচনায় রাকসু নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার স্বার্থে কমিশন আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর-২০২৫ তারিখের পরিবর্তে আগামী ১৬ অক্টোম্বর ২০২৫ তারিখ রোজ বৃহস্পতিবার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।’
এদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক ‘কমপ্লিট শার্টডাউনে’ সোমবার দ্বিতীয় দিনের মত অচল ছিল রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিদ্যাপীঠে এদিন প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি। গোটা ক্যাম্পাসে বিরাজ করছিল ছুটির আমেজ। তবে বিনোদপুর, কাজলা ও মেইনগেটে নগণ্যসংখ্যক প্রার্থীকে লিফলেট বিলি করতে দেখা যায়।
এদিকে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিনসহ তিনজন শিক্ষককে লাঞ্ছিনার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের বহিস্করের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সোমবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে শিক্ষক-কর্মকর্তারা শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িত বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ অ্যাখায়িত করে ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিলের দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে অভিযুক্তরা এখনও আসন্ন রাকসু নির্বাচনে প্রাতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্নও তুলেছেন প্রতিবাদী শিক্ষকেরা।
অন্যদিকে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’র মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন চারটি স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা। সোমবার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ মাকেটের সামনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যথাক্রমে ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ, রাকসু ফর র‌্যাডিকাল চেঞ্জ, সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ ও ইউনাইটেড ফর রাইটস’ প্যানেলের প্রার্থীরা এ মন্তব্য করেন। তারা চলমান আন্দোলন ও ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফুর্ত অনুপস্থিতির বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’র প্যানেলের প্রার্থীরা রাকসু নির্বাচন দুর্গাপুর ছুটির পরে অনুষ্ঠানের দাবি জানান। তবে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল নির্ধারিত তারিখেই (২৫ সেপ্টেম্বর) রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মানববন্ধন
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মানববন্ধন ও সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন অফিসার্স সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচিতে বিভিন্ন বিভাগের শতশত শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন। কর্মসূচিতে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মাসুদুল হাসান খান মুক্তা বলেন, ‘যারা শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতে পারে, তারা ছাত্র নয়। তারা সন্ত্রাসী। এদের কয়েকজন আবার রাকসু নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে আমার প্রশ্ন, প্রকাশ্যে এমন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পরেও তারা কীভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে? অবিলম্বে তাদের প্রার্থীতা বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে।’ শিক্ষকেরা বলেন, ‘আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাহলে আমরা ২৫ তারিখে রাকসু নির্বাচন করব কীভাবে? তারা তো যে কোনো সময় আমাদের ওপর হামলা করতে পারে। আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে? তাই আগে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
শাটডাউনের রাকসু নির্বাচন নয়
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রতিদ্বন্দ্বি চারটি প্যানেলের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান, ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি প্রার্থী ও সাবেক সমন্বয়ক তাসিন খান। তিনি বলেন, ‘২৫ সেপ্টেম্বর রাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা সকলেই উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচারণা করছিলাম। কিন্তু পোষ্যকোটাকে সামনে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, সেখানে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সকলেই পরষ্পরের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। যা আমাদের কখনোই কাম্য নয়। রাকসু আমরা চাই, রাকসু দিতে হবেই। নির্বাচন কোনোভাবেই বন্ধ করা চলবে না। কিন্তু নির্বাচনের প্রাণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ না থাকলে সেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।’
তাসিন বলেন, ‘পোষ্যকোটা ইস্যুতে ক্যাম্পাস কমপ্লিট শাটডাউনের কারণে শিক্ষার্থীরা অলরেডি বাসায় যাওয়া শুরু করেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছুটির পাশাপাশি অনাকাঙ্খিত শাটডাউন আমাদের সকল প্যানেলের, সকল স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারণায় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। এই অবস্থায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য রাকসু নির্বাচন সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করবে।’ তিনি দ্রুত পোষ্য কোটা ইস্যুর মিমাংসা, ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, কমপ্লিট শার্টডাউন ও দুর্গাপূজার ছুটি সবকিছু বিবেচনায় রাকসু নির্বাচন কমিশনকে অতিদ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান। এসময় উল্লিখিত প্যানেলের তাপসি রাবেয়া, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শহীধ জিয়াউর রহমান, বিজয় ২৪ ও সৈয়দ আমির আলি হলের প্রার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন।
রাকসু নির্বাচন পেছানোর পক্ষে ছাত্রদল : অনঢ় ছাত্রশিবির
দুর্গাপূজার পরে রাকসু নির্বাচন চায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে তফসিল অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বরই নির্বাচন চায় ইসলামী ছাত্রশিবির। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ মার্কেটে ছাত্রদলের সহসভাপতি ও ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ আমি চাই রাকসু নির্বাচনটা দুর্গাপূজার পরেই হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমরা দেখছি ৪৮ ঘন্টা আগেও ক্যাম্পাসে যে উৎসবমুখর পরিবেশ এবং ভোটার ও প্রার্থীদের যে আনাগোনা ছিল, সেটা এখন অনেকটাই স্থবির হয়ে গেছে। ভোটার নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বাসায় চলে গেছেন। আমরা চাই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতিতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যদি ভোটারদের উপস্থিতির কথা বিবেচনা করেন, সেক্ষেত্রে আমি বলব আপনারা শিক্ষার্থীদের পালস বোঝার চেষ্টা করেন। নির্বাচনটা আমি চাই দুর্গাপূজার পরেই হোক।’
অনির্দিষ্টকালের কমপ্লিট শাটডাউনে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। রাকসু নির্বাচন উপলক্ষ্যে ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ক্লাস পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। আগামী ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্র ও শনিবার বন্ধ। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটি। মাঝের ২৮ সেপ্টেম্বরই ক্লাস-পরীক্ষার কথা ছিল। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চলমান আন্দোলনের কারণে সেটিও অনিশ্চিত। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে সোমবার বেলা ৩টায় ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটে’র প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করে ২৫ সেপ্টেম্বরেই রাকসুর ভোট গ্রহণের জন্য লিখিতভাবে দাবি জানানো হয়। এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘শুধু একটি সংগঠন নির্বাচন পেছাতে চায়। রাকসু নির্বাচন ২৫ সেপ্টেম্বরেই হতে হবে। নির্বাচন পেছালে শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী হবে না। তাদের মধ্যে হতাশা আরও তৈরি হবে। ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন হচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশ আছে। এটা নষ্ট করার জন্য প্রশাসন দায়ী। প্রশাসন যদি বলে নির্বাচন সঠিক সময়েই হবে, তাহলে শিক্ষার্থীরা থাকবে।’ ভোট পেছালে ছাত্রশিবির কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, পোষ্যকোটা ইস্যুতে গত ২০ সেপ্টেম্বর জুবেরী ভবনে উপ-উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা শিক্ষক-কর্মতাদের সাথে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তিতে জড়ান। ঐ রাতে হাজারো শিক্ষার্থী হল থেকে বেরিয়ে এসে উপাচার্যের বাসভবনের সামনের প্যারিসরোডে বিক্ষোভ শুরু করেন। রাতেই উপাচার্য শিক্ষার্থীদের সামনে এসে পোষ্যকোটায় ভর্তির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যান। রবিবার অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় উপাচার্যের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। এদিকে শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িতদের ব্যবস্থা না নেওয়ায় রবিবার দুপুরে ও রাতে অফিসার্স এসোসিয়েশন এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কমপ্লিট শার্টডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করায় ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতভ্য রাকসু নির্বাচনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments