বিড়ালটি আমার মেয়ের, এখন অবশ্য সবার, সবাই আদর করি

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এক-এগারোর সরকার তো একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি সরকার ছিল। বিবিসি বাংলাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দেশে রাজনীতি গড়ে উঠেছিল, ভুলত্রুটি সবকিছুর ভেতর দিয়ে গণতান্ত্রিক ভিত্তি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল। আমরা দেখেছি যে কীভাবে তারা (এক-এগারো সরকার) সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, বিরাজনীতিকরণ করতে চেয়েছিল। দেশকে একটি অন্ধকার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে দেখেছি যে খুব সম্ভবত তাদেরই ভিন্ন আরেকটি রূপ; অন্যভাবে দেখেছি আমরা ‘ইন দ্য নেম অব ডেমোক্রেসি’।
বিবিসি বাংলাকে গতকাল মঙ্গলবার সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করেছে। গত সোমবার প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল তারেক রহমানের দেশে ফেরা, নির্বাচনে অংশ নেওয়াসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ। দ্বিতীয় পর্বে তিনি উত্তর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে লন্ডনে হওয়া বৈঠক, অন্তর্র্বতী সরকারের কাজ, এক-এগারোর সরকার এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় সংক্রান্ত প্রশ্নের। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে জীবন যাপন করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর এই প্রথম কোনো গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
তারেক রহমানের কাছে বিবিসি বাংলার প্রশ্ন ছিল, পাঁচই আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা দিল্লিতে গেছেন এবং সেখানে আছেন। ভারতের সঙ্গে একটা সম্পর্কের শীতলতা দেখা গেছে, গত এক বছর ধরে। যেমন ধরুন সেটি যাওয়া আসার ক্ষেত্রে ব্যবসার ক্ষেত্রে নানা রকম, সেই ক্ষেত্রে কী কোন পরিবর্তন আপনারা সরকারে আসলে হবে বা পরিবর্তনের ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন, এমন কোন চিন্তা কি আপনাদের আছে? জবাবে তারেক রহমান বলেন, এখন তারা যদি স্বৈরাচারকে সেখানে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, সেখানে তো আমাদের কিছু করার নেই। এটা বাংলাদেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাদের সঙ্গে শীতল থাকবে। সো, আমাকে আমার দেশের মানুষের সঙ্গেই থাকতে হবে।
বিবিসি বাংলার প্রশ্ন ছিল বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে যেই সম্পর্ক ছিল, সেটা নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। তো ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আপনাদের নীতি কী হবে? তারেক রহমান বলেন, আমার মনে হয়, আপনি একটু আগে যে প্রশ্নগুলো করেছেন, সেখানে বোধহয় আমি ক্লিয়ার করেছি পুরো ব্যাপারটা। সবার আগে বাংলাদেশ। এখানে তো আপনি পার্টিকুলার (সুনির্দিষ্ট) একটি দেশের কথা বলেছেন। এখানে ওই দেশ বা অন্য দেশ তো বিষয় না। বিষয় তো হচ্ছে, ভাই বাংলাদেশ আমার কাছে আমার স্বার্থ, আমি আগে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ দেখবো, আমার দেশের স্বার্থ দেখবো। ওটাকে আমি রেখে আপহোল্ড করে আমি যা যা করতে পারবো, আমি তাই করবো।
বিবিসি বাংলা প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের স্বার্থ আপনারা সবার আগে নেবেন, সেটা আপনি পরিষ্কার করেছেন। ভারতের কথা বিশেষভাবে আসছে যেহেতু সেটি বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ এবং বাংলাদেশের তিন পাশেই এই দেশটির সীমান্ত রয়েছে। এবং এটি নিয়ে আপনিও জানেন যে, বিভিন্ন সময়ে কথা হয়েছে, অন্তর্র্বতী সরকারের সময়েও কথা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সময় তো সম্পর্ক নিয়ে বললামই সেটা নিয়ে কথা হয়েছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত বা কেমন থাকা প্রয়োজন- এ নিয়ে আপনার চিন্তা কি? জবাবে তারেক রহমান বলেন, অবশ্যই আমি আমার পানির হিস্যা চাই। অবশ্যই আমি দেখতে চাইনা না যে, আরেক ফেলানী ঝুলে আছে। অবশ্যই আমরা এটা মেনে নেবো না।
বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে তারেক রহমানের কাছে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের স্বার্থের প্রসঙ্গে আপনি বলছেন যে, পানির হিস্যা চাওয়া এবং সীমান্ত হত্যার বিষয়টি নিয়ে আপনারা সোচ্চার থাকবেন? তারেক রহমান এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, না না, আমি উদাহরণ দিয়ে বললাম। দুটো উদাহরণ দিয়ে বুঝালাম আপনাকে, যে আমাদের স্ট্যান্ডটা কি হবে। আমরা আমাদের পানির হিস্যা চাই। অর্থাৎ আমার দেশের হিস্যা, মানুষের হিস্যা আমি চাই, হিসাব আমি চাই। আমার যেটা ন্যায্য সেটা আমি চাই। অবশ্যই ফেলানী হত্যাকান্ডের মাধ্যমে আমি বুঝাতে চেয়েছি যে, আমার মানুষের উপরে আঘাত আসলে অবশ্যই সেই আঘাতকে এভাবে আমি মেনে নেবো না।
বিএনপি একমত না হলে বেঠিক, এটি তো গণতন্ত্র হলো না: সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক জোটগুলোর মধ্যে মতবিরোধ নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলে সেটি সমস্যা, অর্থাৎ বিএনপিকে অ্যাগ্রি করতে হবে সবার সঙ্গে, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু বিএনপি যদি কোনোটার সঙ্গে একমত না হয়, তাহলে বেঠিক। এটি তো গণতন্ত্র হলো না।’ সাক্ষাৎকারে সংস্কারের কিছু বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের কিছুটা মতপার্থক্য বা মতবিরোধ নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তারেক রহমানকে। এক ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা বা দলের প্রধান থাকার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। এসব প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাকে অন্যের সঙ্গে একমত হতে হবে, তাহলে গণতন্ত্র। আমি যদি অন্যের সঙ্গে দ্বিমত করি, তাহলে গণতন্ত্র নয়। এটি কেমন গণতন্ত্র? কারণ, গণতন্ত্রের মানেই তো হচ্ছে বিভিন্ন মতামত থাকবে। আমরা অনেক ব্যাপারেই একমত হব হয়তো। সব ব্যাপারে একমত হব না, কিছু ব্যাপারে হয়তো দ্বিমত থাকতেই পারে, এটাই তো গণতন্ত্র, এটাই তো এসেন্স অব গণতন্ত্র।’
সংস্কার ইস্যু নিয়ে কোনো ব্যাপারে হাইড অ্যান্ড সিক করছেন না বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি যেটা মনে করছি যে ভাই আমি মনে করছি, যেটা আমার দৃষ্টিতে ঠিক না, আমি বলছি ঠিক না।’ প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এই যে বাংলাদেশে রাষ্ট্র মেরামতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, থাকবেন না। এ রকম আরও যে বিষয় আছে, এগুলো বাংলাদেশে যখন স্বৈরাচার ছিল, তাদের মুখের ওপরে, তাদের চোখের দিকে চোখ রেখে আমরা বিএনপিই বলেছিলাম।’ এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরো বলেন, এখন অনেকে সংস্কারের কথা বললেও সেদিন সংস্কারের ‘স’-ও কেউ বলেননি।
আমরা চাই অন্তর্র্বতী সরকার সফল হোক: সরকারের সাথে সম্পর্ক কেমন এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘বিষয়টি তো রাজনৈতিক, কোনো ব্যক্তির বিষয় নয়। প্রথম থেকেই বলেছি, আমরা চাই এই অন্তর্র্বতীকালীন সরকার সফল হোক। কিছু সংস্কারের বিষয় আছে। একই সাথে প্রত্যাশিত সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বাধীন নির্বাচনের বিষয়ও আছে। আমরা আশা করি, তারা তাদের মূল দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন করবেন।’ বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরো বলেন, আমরা আশা রাখি, তারা কাজটি সুন্দরভাবে করবেন। আর তারা কতটা ভালোভাবে করতে পারবেন, সেটার ওপরই সম্পর্কের উষ্ণতা বা শীতলতা নির্ভর করবে। অন্তর্র্বতী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে আগের মন্তব্যের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘যখন আমি সে কথা বলেছিলাম, তখন পর্যন্ত তারা নির্বাচনের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেয়নি। সে কারণে শুধু আমার নয়, প্রায় সবার মধ্যেই সন্দেহ ছিল। পরে অন্তর্র্বতী সরকার প্রধান ড. ইউনূস রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। পাশপাশি নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় সন্দেহ ধীরে ধীরে কেটে গেছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমি মনে করি, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত দৃঢ় থাকবেন, তাদের বক্তব্য ও কাজে সেই দৃঢ়তা বজায় রাখবেন, ততই এই সন্দেহ দূর হবে।’
লন্ডনে ড. ইউনূসের সাথে তার বৈঠক নিয়েও সাক্ষাৎকারে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘তিনি (ড. ইউনূস) অত্যন্ত স্বনামধন্য ও বিজ্ঞ মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সৌজন্যমূলক কথাবার্তা হয়েছে। তিনি আমার কাছে জানতে চান, জনগণ আমাদের সুযোগ দিলে আমরা দেশের জন্য কী পদক্ষেপ নেব? দেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আমাদের কিছু পরিকল্পনা তার সাথে শেয়ার করেছি।’ অন্তর্র্বতী সরকারের এক বছরের কার্যক্রমের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘অন্তর্র্বতীকালীন সরকার মানে তো ক্ষণস্থায়ী বিষয়। একটি বিশাল জনবহুল দেশ পরিচালনা করতে জনগণের ম্যান্ডেটসহ শক্তিশালী রাজনৈতিক সরকারের প্রয়োজন। তারপরও আমি মনে করি, তারা অনেক ক্ষেত্রে চেষ্টা করেছেন। সবখানে সফল হওয়া সম্ভব নয়, সীমাবদ্ধতা থাকাটাই স্বাভাবিক।’
বিড়ালটি আমার মেয়ের, এখন অবশ্য সবার, সবাই আদর করি: প্রাণী ও প্রকৃতি নিয়ে নিজের স্মৃতি-অনুভূতি-দায়িত্বের কথা জানালেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোষা বিড়ালের সঙ্গে নিজের ছবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিড়ালটি আমার মেয়ের বিড়াল। ও এখন অবশ্য সবারই হয়ে গিয়েছে। আমরা সবাই ওকে আদর করি।’ তারেক রহমান বলেন, ‘কুকুর-বিড়াল ছিল, গরু-ছাগল ছিল, হাঁস-মুরগি ছিল। পাখি ছিল, ময়না ছিল, কবুতর ছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা চিন্তা করি, আমাদের আল্লাহ সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তৈরি করেছেন। আমাদের দায়িত্ব কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টি যা কিছু আছে প্রকৃতির, তার প্রতি কিন্তু যতœ নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এটি একটি বিষয়।’ তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আমরা যদি মানবিক দৃষ্টিকোণ অথবা আমরা যদি নেচার থেকেও বিষয়টি দেখি, দেখুন ওরা না থাকলে কিন্তু আমাদের জন্য বেঁচে থাকা কষ্টকর।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments