আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় অস্ত্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। তবে এরই মধ্যে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে সম্ভাব্য অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। বিএনপি, জামায়াত ইসলাম, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন দল তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করার পর মাঠে চিত্র পাল্টে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকাগুলোতে অনেক প্রার্থীর প্রতিপক্ষরা মহড়া দিচ্ছে। এ নিয়ে প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্রের মহড়াও দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলগুলোতে নানা ধরনের উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। এমন উদ্বেগের মধ্যেই গত বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের চান্দগাঁও চালিতাতলী এলাকায় নির্বাচনী জনসংযোগের সময় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন। সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে একজন নিহতও হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হলেও ৫ আগষ্টের পর লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রায় ৩০ ভাগ উদ্ধার হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগষ্টের পর লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে কিছু অস্ত্র স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্রের হাতে এখনও রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্র নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মককান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, গাজীপুর, যশোর ও সিলেট অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে অস্ত্রের প্রদর্শন ও ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইসফাক ইলাহি বলেন, নির্বাচনের আগেই যেভাবে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, তাতে তো আমাদের নারী ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে একটা আতংকের সৃষ্টি করতে পারে। নির্বাচনের আগেই এসব আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে হবে এবং সেটা জনগণের কাছে নিশ্চিত একটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জানাতে জবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। আমাদের পুলিশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও তাদের সক্ষমতা এখনও স্বাভাবিক স্থানে নিতে পারিনি। তবে যৌথ বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো অভিযান চালাতে হবে। যাতে জনগণের মাঝে স্বস্থি আসে।
গত ৭ অক্টোবর খুলনায় ইমরান মুন্সী (৩২) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম শহরের বাকলিয়া এলাকায় দুই পক্ষের গোলাগুলিতে মো. সাজ্জাদ নামে ছাত্রদলের এক কর্মী নিহত হন। সাজ্জাদ চট্টগ্রাম নগর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হকের অনুসারী। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর খুলনার পূর্ব রূপসায় সোহেল হাওলাদার (৩৫) নামে এক প্রবাসীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
৫ আগষ্টের পর যৌথ বাহিনীর চলমান অভিযানে এখন পর্যন্ত ৩৫০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় পাঁচ হাজার রাউর গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর এই অভিযান চলমান রয়েছে। গত বুধবার সেনা সদর দপ্তরে সেনা বাহিনীর এক প্রেস ব্রিফিংয়েসেনা সদরের পরিচালক ( মিলিটারি অপারেশন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ৫ আগষ্টের পর লুট হওয়া অস্ত্র- গোলাবারুদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ উদ্ধার হয়েছে।
সেনাবাহিনী গত ২৬ অক্টোবর রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি নির্দিষ্ট বগি তল্লাশি করে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬ রাউন্ড অ্যামুনিশন, ২.৩৯ কেজি গান পাউডার ও ২.২৩ কেজি প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সীমান্তের ওপার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আনা হয়েছে। এ ঘটনার পর ৩১ অক্টোবর সুনামগঞ্জের ছাতকের সীমান্তবর্তী এলাকা ছনবাড়ী থেকে বিজিবি ২৫০ গ্রাম প্লাস্টিক বিস্ফোরক ও ২ টি ডেটোনেটর উদ্ধার করে।
র্যাব জানায়, এ পর্যন্ত ৪৮৪টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে র্যাবের লুট হওয়া ১৬৮টি অস্ত্রের মধ্যে ৯০টি, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ২২৮টি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৬৬টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গোলাবারুদের ক্ষেত্রে র্যাবের ৭ হাজার ৩০৩ রাউন্ড, পুলিশের ১১ হাজার ৯৪১ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে। আর অবৈধ গোলাবারুদ ১ হাজার ২৮০ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার-সংক্রান্ত মামলায় ৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অস্ত্র-গোলাবারুদ আসছে সীমান্ত পথে ঃ
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বড় অংশ সীমান্তপথে আসছে। কিছু অস্ত্র সরকারি বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্রের সাথেও মিশে গেছে। নির্বাচনের আগেই এসব নিয়ন্ত্রণে না আনলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, সীমান্তের অন্তত ২৫টি পথ দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। এর মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি, থানচি, নেফিউ পাড়া, তমব্রু, কক্সবাজারের টেকনাফের কুতুবপালং ও উখিয়া, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, আখাউড়া, রাজশাহীর গোদাগাড়ি, চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, রহনপুর, সোনা মসজিদ,আজমতপুর, বিলভাতিয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলি, সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা ও শাঁকারা, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, মেহেরপুরের গাংনী ও কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্ত এলাকা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত অস্ত্রবিহীন পরিবেশ নিশ্চিতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করা। তারা সতর্ক করে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার শুধু নির্বাচনী সহিংসতা নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া এ্যান্ড প্লানিং শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরুস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। এতে অভিযানে আরো সুফল বয়ে আনবে।



