রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটেই (সিসিইউ) টানা এক সপ্তাহ যাবত চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন,সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থার পরিবর্তর হয়নি। তাঁর শারীরিক অবস্থা এখনো উদ্বেগজনক। গতকাল বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য বিশিষ্ট হেমাটোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নুরুদ্দীন আহমদ জানান, নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা ম্যাডামের অবস্থা অপরিবর্তিত।আগের মতোই আছেন। উন্নতি বা অবনতি কোনোটাই বলা যাচ্ছে না। তবে চিকিৎসকদের ডাকে চোখ মেলছেন কখনো কখনো। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত¡বধায়নে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিকিৎসা চলছে তার।
চীনের পর গতকাল সকালে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিলি ঢাকায় এসে মেডিকেল টিমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমান শারীরিক অবস্থার কারণে তাঁকে অন্য কোথাও স্থানান্তর করার বিষয়ে সংশয় কাটাতে পারছেন না চিকিৎসকেরা। বিএনপি চেয়ারপারসনের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে সব রকমের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়া চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন চিকিৎসক গতকাল বুধবার রাতে জানান, ফুসফুসে স্বাভাবিকভাবে বাতাস চলাচল করানোর জন্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিডনি কার্যক্রম সচল রাখতে বিকালে খালেদা জিয়ার ডায়ালাইসিস করা হয়েছে। এদিকে গতকাল রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। হাসপাতালে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন।কিছুক্ষণ খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে অবস্থান করেন এবং চিকিৎসকদের কাছে তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন প্রধান উপদেষ্টা। মিনিট বিশেক পর হাসপাতাল ত্যাগ করেন তিনি।
এরআগে দুপুরে খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ারে যান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুর জাহান বেগম ও বিকেলে যান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম। আগের রাতে গিয়েছিলে জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমান। দিনভর এভারকেয়ার হাসপাতালকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। সকাল থেকেই বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এভারকেয়ার হাসপাতালের মূল ফটকে। ভেতরে আছেন এসএসএফ। গতকাল দুপুরে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। পরে তার একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বলেন, ম্যাডাম (ফরিদা আখতার) বিএনপি চেয়ারপারসনকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি সিসিইউ’র ভিতের গিয়েছিলেন। উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন রেসপন্স করেছেন। ইশারায় সালামের জবাব দিয়েছেন। গত ২৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। ২৭ নভেম্বর থেকে তিনি ওই হাসপাতালের সিসিইউতে আছেন।
যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদল যুক্ত হয়েছেন:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডেকে সহযোগিতা করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ঢাকায় এসেছে।গতকাল বুধবার সকালে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিলি ঢাকা আসেন। দুপুরে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। রিচার্ড বিলিসহ তিনদিন আগে আসা চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের নিয়ে মেডিকেল বোর্ড রাতে বৈঠক করেন। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সর্বশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন।
মেডিক্যাল বোর্ডের আরেকজন চিকিৎসক বলেন, ম্যাডামের অবস্থা স্থিতিশীল আছে। কিছুটা রেসপন্স করছেন। চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যরা ডাক দিলে কিছুটা সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এটাকে আশানুরূপ উন্নতি বলা যাচ্ছে না। তার স্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্যারামিটার ওঠানামা করছে। তিনি জানান, প্রতি রাতেই ঘণ্টা দেড়েক বৈঠক করে বিএনপি চেয়ারপারসনের মেডিক্যাল বোর্ড। যেখানে দেশি-বিদেশি অন্তত দেড় ডজন চিকিৎসক যুক্ত হন। লন্ডন ক্লিনিকের বিখ্যাত চিকিৎসকরাও যুক্ত হন। অধীনে খালেদা জিয়া লন্ডনে মাসব্যাপী চিকিৎসা নিয়েছেন। ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকেন ছেলে তারেক রহমান,পুত্রবধু ডা. জুবাইদা রহমান। বৈঠকের পর নতুন করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়েছে৷ পরীক্ষার রিপোর্ট পেলে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনা হয়। এভাবেই চলছে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা। আশানুরূপ উন্নতি না হলে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হƒদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। লন্ডন ক্লিনিকে টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫ জানুয়ারি ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডনের ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত¡াবধানে চিকিৎসা নেন। যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে গত ৬ মে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
নল দিয়ে খাবার ও ওষুধ গ্রহণ করছেন:
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে মঙ্গলবার ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে যান কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা। খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে না পারলেও তার সাক্ষাৎ হয়েছে তার সার্বক্ষণিক সহযোগী ফাতেমার সঙ্গে। কনকচাঁপা জানান, ফাতেমা তাকে জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া নল দিয়ে খাবার ও ওষুধ গ্রহণ করছেন এবং আগের দিনের তুলনায় তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, খালেদা জিয়া দু-একবার চোখ খুলে তাকাচ্ছেন।
সুস্থতা কামনায় দোয়া ও মোনাজাত:
এদিকে বুধবারও রাজধানীসহ সারাদেশে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেন দলটির নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে জাতীয়তাবাদী কৃষকদল ও পল্লী চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এসময় বিএনপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর শ্যামলীতে দোয়া মোনাজাত ও সদকায়ে জারিয়া হিসেবে স›দ্বীপের মুছাপুরে জনদুর্ভোগ লাগবে কাঠের ব্রিজ নির্মান করে দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ সাধারণ সম্পদক রফী উদ্দীন ফয়সাল। এদিন বাদ আছর রাজধানীর পল্লবী সিটি ক্লাব মাঠে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মোনাজাতের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহবায়ক আমিনুল হক। বিএনপির জাতীর নির্বাহী কমিটির সহ-যুববিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেছেন, দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা শেখ হাসিনার কারণেই। বুধবার পুরান ঢাকায় খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া ও আলোচনা সভা আয়োজন করেন বংশাল থানা বিএনপির উদ্যোগে।সভায় সভাপতিত্ব করেন বংশাল থানা বিএনপির ৩২ নং ওয়ার্ডের সভাপতি হায়দার আলী বাবলা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ও বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি যুগ্ম আহŸায়ক মীর আশরাফ আলী আজম, বিএনপি সদস্য ও চকবাজার থানা বিএনপির সাবেক কমিশনার আনোয়ার পারভেজ বাদল, ২৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আবদুল আজিজ প্রমুখ। এদিকে মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ।
এদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আপডেট জানতে প্রতিদিনই হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় ভিড় করছেন দলটির নেতাকর্মী ও সাধারন মানুষ।



