হাদির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল

‘হারাম খাইয়া আমি এত মোটাতাজা হই নাই, যাতে আমার স্পেশাল কফিন লাগবে; খুবই সাধারণ একটা কফিনে হালাল রক্তের হাসিমুখে আমি আমার আল্লাহ্র কাছে হাজির হবো’

জীবদ্দশায় নিজের ফেসবুকে লিখে যাওয়া এই প্রার্থনাই যেন বাস্তব হয়ে গেল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির সাহসী যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির দুনিয়া থেকে চিরবিদায়ের যাত্রায়। সহকর্মীসহ লাখো মানুষের অশ্রæসিক্ত ভালোবাসায় বিদায় নিলেন।

পরিবারের চাওয়া অনুসারে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে। গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নামাজে জানাজা শেষে বিকাল চারটার কিছু সময় আগে তাকে সমাহিত করা হয়।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। যা ছিল স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা। জানাজায় অংশ নিতে আসা ছাত্র-জনতাসহ লাখো মানুষ সকাল থেকেই নিরাপত্তা আর্চওয়ে গেট দিয়ে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রবেশ করেন।

শহীদ হাদির আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তারা। জানাজা ঘিরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের দক্ষিণাংশের দুটো মাঠ ও আশপাশের এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজা পড়ান ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। জানাজা শেষে কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পর্যন্ত আসেন হাদির ভক্ত-অনুসারীরা।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেখা যায়, ফার্মগেট, আসাদ গেট হয়ে দলে-দলে মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ঢুকছেন। কেউ হাতে, কেউ মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে জানাজায় অংশ নিতে এসেছেন। দক্ষিণ প্লাজার ভেতরে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা নানা ¯েøাগান দেন। ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ইত্যাদি ¯েøাগান দেন তারা। কেউ হাদির মৃত্যুতে অশ্রæসিক্ত হন। আবার কেউ ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ¯েøাগান দেন এবং হাদি হত্যার বিচার দাবি করেন।

বেলা ২টার আগে ওসমান হাদির মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নিয়ে আসা হয়। এরপরই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষিণ প্লাজায় আসেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ও এনসিপির আহŸায়ক নাহিদ ইসলাম ছিলেন। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ উপদেষ্টা পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজায় অংশ নেন।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ তিন বাহিনী প্রধানও জানাজায় শরিক হন। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ অন্য নেতারা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, ডাকসু নেতারা এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

জানাজার আগে দেওয়া বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘প্রিয় হাদি, আজকে আমরা তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলে গেছো সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি। সেই ওয়াদা করতে এসেছি। শুধু আমরা না বাংলাদেশের সব মানুষ সেই ওয়াদা পূরণ করবে। হাদি তুমি হারিয়ে যাবে না। কোনোদিন তোমাকে কেউ ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে।’
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের আগে হাদির জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। বক্তব্য রাখেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।

তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ওসমান হাদির খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। খুনি, পরিকল্পনাকারী, সহায়তাকারীসহ পুরো চক্রকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সচিবকে পদত্যাগ করতে হবে। জীবন দিয়ে দেব, তবু ইনসাফের লড়াই ছাড়ব না। হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব থাকবে, ইনসাফ কায়েম হবে; নয়তো আমরা রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের পরেই পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তৃতা দেন হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। বড় ভাইয়ের বক্তৃতার সময় জানাজায় উপস্থিত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে তিনি হাদির জানাজায় ইমামতি করেন।

জানাজায় অংশ নিতে আসা শহিদ হাদির সহকর্মীরা অশ্রæসিক্ত হয়ে পড়েন। শপথ নেন হাদির স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখবেন। তারা বলেন, লাখো মানুষের ভালোবাসা প্রমাণ করে জীবিত হাদির চেয়ে শহিদ হাদি অনেক শক্তিশালী।

দৈনিক ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এপর্যন্ত তৃতীয় শহীদ হিসেবে আল্লাহ তাকে কবুল করেছেন।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। দেশের জন্য তার যে ত্যাগ আল্লাহ তা কবুল করুক।’ তিনি বলেন, তার পরিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত পরিবারের অংশ। আমরা তার চ‚ড়ান্তভাবে সম্মান জানাতে আমাদের এ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে কবরস্থ করা হয়েছে।

আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সন্তানকে বুকে নিয়েছে। মা তার ছেলেকে বা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে গ্রহণ করেছে। বক্তব্য শেষে দোয়া পরিচালনা করেন হাদির বড় ভাই। এসময় হাদীর পরিবারের লোকজনও উপস্থিত ছিলেন।

ওসমান হাদির জানাজা উপলক্ষে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের প্রবেশপথগুলোতে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষকে কয়েক স্তরে তল্লাশি করে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও টহল দেন। মোতায়েন ছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্য। ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জানাজা উপলক্ষে এক হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরাসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে যান চলাচল সীমিত করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে শরিফ ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় হাদির মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। রাতে হাদির মরদেহ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। গতকাল সকালে ময়নাতদন্তের জন্য হাদির মরদেহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আবার নেওয়া হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকেই মরদেহ নেওয়া হয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments