চরমোনাইয়ের দলের ২৬৮টি আসনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা

জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের যে নির্বাচনি ঐক্য হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি ২৬৮টি আসনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান এই ঘোষণা দেন।

গাজী আতাউর রহমান জানান, তাদের প্রার্থীরা ২৭০টি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে দুটি আসনে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। বাকি ২৬৮ জন প্রার্থী এখনো কাজ করছেন। তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের একজনও প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন। জোটগত নয় বরং দলীয় শক্তিতেই তারা নির্বাচনে লড়বেন।

তিনি বলেন,আমরা যে নীতি-আদর্শকে ঘিরে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নেমেছিলাম, এখন সেই নীতি-অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের আগেই যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে যাচ্ছে, কাজেই প্রশ্ন উঠছে এটি ইলেকশন হবে নাকি সিলেকশন। পাঁতানো নির্বাচন হতে পারে এমন শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন,ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী আন্দোলন ২৭০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। এর মধ্যে দুজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। বাকিদের এখনো ভোটের মাঠে থাকতে বলা হয়েছে।

গাজী আতাউর রহমান বলেন , জামায়াতে ইসলামী ইসলামের পথ থেকে সরে যাওয়ায় ইসলামী আন্দোলন এই ঐক্য থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র কাঙ্খিত আসন না পাওয়ার বিষয়টি নয়, যে উদ্দেশ্যে জোট গঠিত হয়েছিল সেখান থেকে জোটের বড় দল জামায়াতে ইসলামী সরে আসার কারণে আমরা তাদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় থাকছি না। গাজী আতাউর রহমান বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশে সুশাসন ও ইসলামী ব্যবস্থা কায়েমে ইসলামী দলগুলো ভোট একটি বাক্সে যাবে। ইসলামী দলগুলোর ‘এক বাক্স’ ভোটের নীতি প্রথম আমরা ঘোষণা করেছিলাম। যাতে পরে জামায়াত ইসলামী যুক্ত হয়।

ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন,জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন। এতে আমরা মর্মাহত হয়েছি।

নির্বাচনি প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়,ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর তীব্র সমালোচনা করে গাজী আতাউর রহমান বলেন, জামায়াতের আমির স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে ইসলামী শরীয়া আইনের বদলে প্রচলিত আইনে নির্বাচন করবেন। জন্মের পর থেকে ‘আল্লাহর আইন চাই’ শ্লোগান দিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে তারা সেই অবস্থান থেকে সরে গেছেন। এছাড়া জামায়াতের আমির তারেক রহমানের সাথে দেখা করে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের আলোচনা করলেও ইসলামী আন্দোলনের সাথে কোনো পরামর্শ করেননি।

গাজী আতাউর রহমান আরো বলেন , গত ৯ ডিসেম্বর দুই আমিরের বৈঠকে প্রথম আলোর একটি জরিপ (যেখানে ইসলামী আন্দোলনের সমর্থন ০.১ শতাংশ দেখানো হয়েছিল) নিয়ে তাদের আমিরকে অপমান করা হয়েছে। জামায়াত যে আসনগুলো ছেড়েছিলো, সেগুলো তারা ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে দিয়েছিল বলে মনে করছে ইসলামী আন্দোলন, যা তাদের আত্মসম্মানবোধে লেগেছে।নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত ‘ইলেকশন’ হবে নাকি ‘সিলেকশন’—তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জামায়াতের মতলব ভালো নয়।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কঠোর সমালোচনা করে ইসলামী আন্দোলন। বিশেষ করে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যের সূত্র ধরে অভিযোগ করা হয় যে, দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে ‘আল্লাহর আইনের’ পরিবর্তে ‘প্রচলিত আইনে’ দেশ চালানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

জামায়াতের এই অবস্থানকে ‘আদর্শচ্যুতি’ উল্লেখ করে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন,আমরা অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন। এতে আমরা মর্মাহত হয়েছি।

তিনি আরও বলেন,জামায়াতে ইসলামীর শ্লোগান ছিল ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’। কিন্তু এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হওয়ায় তারা সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতাকেই মুখ্য মনে করছে।

উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন,আমরা নীতি-আদর্শের রাজনীতি করি। ক্ষমতার জন্য আমরা আমাদের কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারি না। যেহেতু প্রধান কিছু রাজনৈতিক শক্তি এখন আল্লাহর আইনের বদলে প্রচলিত আইনের পথে হাঁটার কথা বলছে, তাই আমরা তাদের সহযোগী হওয়ার জন্য প্রস্তুত নই।

সমঝোতার নির্বাচনের শঙ্কা জানিয়ে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র আরও বলেন, জামায়াত আমির বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন ‘আগামীতে ক্ষমতায় গেলে বেগম জিয়ার ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করবেন’। এমন বক্তব্য আমাদেরকে শঙ্কিত করেছে, আগামীতে পাতানো নির্বাচন হবে। আমরা কোনো পাতানো নির্বাচনে কারো সমঝোতার অংশ হতে চাই না।

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, জামায়াত আমির বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন ‘আগামীতে ক্ষমতায় গেলে বেগম জিয়ার ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করবেন’। এমন বক্তব্য আমাদেরকে শঙ্কিত করেছে, আগামীতে পাতানো নির্বাচন হবে। আমরা কোনো পাতানো নির্বাচনে কারো সমঝোতার অংশ হতে চাই না।

দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর আরও বলেন, একটি দলের কর্মকা- বারবার আমাদের দলের আত্মসম্মানবোধে আঘাত করেছে। কারো অনুগ্রহের আসন নিয়ে আমরা রাজনীতি করতে চাই না। আমাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় থাকবে। আমাদের দলের সব নেতাকর্মীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, শালীনতাবোধ বজায় রাখার জন্য।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি আরও বলেন,জামায়াতে ইসলামের আমির আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই বিএনপির প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে সমঝোতা ও ভাগাভাগির কথা বলেছেন। এর পর থেকেই আমাদের মধ্যে শঙ্কা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে—এই নির্বাচন পাতানো হবে কি না।ইসলামী আন্দোলনের নেতারা মনে করছেন, আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়াই তাদের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তিনি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিত নারী, তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি, জামায়াতের আমির শরিয়া প্রতিষ্ঠা, শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না। এই ওয়াদা তিনি করেছেন।

এজন্য আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। এই বিষয়টা যখন আমরা জানতে পারলাম তখন আমরা স্পষ্ট হয়ে গেলাম, আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে চলছি সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। কারণ, আজ যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার মতো একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এখন যারা প্রধান শক্তি তারাই যদি ইসলামের সমান আদর্শ থেকে ভিন্ন দিকে চলে যায়, যদি ইসলামী আইনের প্রতি তাদের আস্থা না থাকেৃ তাহলে আমরা যে কর্মী, সমর্থক সারা দেশে ইসলামের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। এই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, দলটি শেষ সময়ে এসে নতুন তিনটি দল যুক্ত করাসহ অনেক সিদ্ধান্ত কাউকে না জানিয়ে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে কিছু কিছু বিষয় না জানানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে ইনসাফ বাদ দিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত যে,নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বে যে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়ে ওঠে, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই যুগপৎ আন্দোলন।

শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ছিল এই মোর্চায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এলডিপি এবং তার পরদিন এবি পার্টি এই জোটে যোগ দেয়।

কিন্তু ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এনসিপির জোটে আসা নিয়ে আপত্তি তোলে। শেষ পর্যন্ত মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে রাজি করানো গেলেও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত জোটের দূরত্ব বেড়ে যায়।

গত দুই সপ্তাহে আগামী নির্বাচনের আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারছিল না ইসলামী আন্দোলন। তাদের দাবি ছিল দেড়শর বেশি আসন। সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী আসন না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের’ বৈঠকে যায়নি দলটি।

বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলনে এসে ৮টি দলের আসন ভাগাভাগির হিসাব তুলে ধরেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। ওই ঘোষণায় ইসলামী আন্দোলন, জাগপা ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের জন্য আসন চূড়ান্ত করা হয়নি।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ‘আশা’ করছিল, ইসলামী আন্দোলন শেষমেশ তাদের জোটেই যোগ দেবে এবং সেই ‘আশা’ থেকে ৪৭টি আসনের বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে চরমোনাই পীরের দল শেষ মুহূর্তে এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments