চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সোমবার বিকালে অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় ১ র্যাব কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন । নিহত কর্মকর্তা হলেন ডিএডি মোতালেব। তিনি ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হন। তিনিসহ আরো ৪ জন ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হলে তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় কর্তব্যরত চিকিৎসক ডিএডি মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য ৩ জন র্যাব সদস্য চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই ঘটনায় হামলাকারীরা এক পর্যায়ে ৩ র্যাব সদস্য ও ১ জন নাগরিককে জিম্মি করে ফেলে। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে জিম্মি হওয়া ৩ র্যাব সদস্য ও ১জন বেসামরিক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
র্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম র্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গেলে দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় এক সদস্য গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া তিনজন র্যাব সদস্যকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পারেন। আহত সদস্যকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সীতাকুন্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্ঠা করে।
জানা গেছে, সীতাকুন্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি এখনো সশস্ত্র পাহারার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের জঙ্গল সলিমপুর এলাকার লিংক রোডসংলগ্ন জমির বাজারমূল্য শতকপ্রতি ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা, হত্যাকান্ড ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। এ নিয়ে একাধিক হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটে। সর্বশেষ সেখানে দুটি পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। এর পরদিন ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান ও পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের উদ্যোগ হামলার মুখে পড়ে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম সতর্ক হয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে জমি উদ্ধার সম্ভব না হওয়ায় কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।



