হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। বার বার চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও বর্তমান বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বর্তমান প্রশাসন চালুই তো করতে পারেনি উল্টো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেনা পাওনা নিয়ে জটিলতায় পাকিয়ে ১৬৫০ কোটি টাকার খড়গ নেমে এসেছে ।
বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে লাউঞ্জ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে একগুয়েমি সিদ্ধান্ত নিয়ে উচ্ছেদ করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সেও ভয়াবহ আগুনে হাজার কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই।
বেবিচকের বর্তমান প্রশাসনের একের এক ব্যর্থতায় দেশে এবংর দেশের বাইরে এভিয়েশেন সেক্টরে ভয়াবহ ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। আর এসবের নেপথ্যে কাজ করেছে বর্তমান বেবিচক সদস্য (অপারেশনস) মেহবুব খান। পুরো বেবিচকের নিয়ন্ত্রন এক প্রকার তার হাতে নিয়েই একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে হাজার হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির সন্মুখিন করেছেন তিনি।
কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো অন্তর্বতি সরকার আর বর্তমানে বিএনপির শীর্ষ নেতার আত্নীয় পরিচয়ে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। আর এই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থার্ড টার্মিনাল চালু ঘোষণাও দিয়েছেন। এমন ঘোষণার পর থেকে বেবিচক জুড়ে তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা সমালোচনা। যে ব্যক্তির একের পর বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ইতিহাসের সবচেয়ে আর্থিক ক্ষতির সন্মুখিন বেবিচক সেই ব্যক্তি এ রকম গুরুত্বপুর্ণ পদে থাকলে থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়া নিয়ে শঙ্কা থাকবে বলে মনে করছেন খোদ বেবিচকের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারি থার্ড টার্মিনাল চালুর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে তিনি থার্ড টার্মিনাল নির্মানকাজে অংশ নেয়া এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) এর সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেন। যতদ্রুত সম্ভব চালুরও নির্দেশ তিনি।
ওই বৈঠক শেষে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন যেন সামনে থার্ড টার্মিনাল চালু করা যায়। সে ব্যাপারে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বেবিচকের এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এতদ্রুত প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে ভেবে এ রকম সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যা খুবই প্রশংসার দাবিদার। তবে পূর্বেই থার্ড টার্মিনাল চালু করা যেত। শুধুমাত্র উর্ধ্বতন গুটি কয়েক কর্মকর্তার অদক্ষতা ও একগুয়েমির কারণে সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে থার্ড টার্মিনাল নির্মানে অংশ নেয়া জাপানের মিৎসুবিশি করপোরেশন ও ফুজিতা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশনের যৌথভাবে ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’ নামে একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দেনা পাওনা নিয়ে কর্মকর্তাদের উদাসিনতা ছিল চরমে। এমনকি মেগা এই প্রজেক্টকে বিতর্কিত করতেও তারা ছিল মরিয়া।
এ কারণে অন্যতম এই মেগা প্রজেক্টের কাজ শেষ হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধুমাত্র তাদের কারণে এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) দেনা পাওনা পরিশোধে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যায়। যা দেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন করে। ওই রায়ে তাদের পক্ষে যায়। যার কারণে ১৬৫০ কোটি টাকা দিতেই হচ্ছে।
এছাড়াও এই কর্মকর্তারা কক্সবাজার বিমানবন্দরকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করে দেয়। পরবর্তীতে সেটি চালুর আগেই আবার বন্ধও ঘোষণা করতে হয়। এতে করেও এভিয়েশন বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে যায় হাজার কোটি টাকার মালামাল। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিও বেবিচকের কর্মকর্তাদের চরম উদাসিনতাকে সামনে আনে। সদস্য (অপারেশনস) মেহবুব খান ও সদস্য (নিরাপত্তা) আসিফ ইকবালকে দায়ী করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে এই দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের করা জন্য বলা হলেও এখনো সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি বলে গুঞ্জন রয়েছে।
জানা যায়, সদস্য অপারেশনস মেহবুব খানের একগুয়েমির কারণে বেবিচক শত শত কোটি টাকা রাজস্বও বঞ্চিত হয়েছে। বিমানবন্দরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হটাৎ করেই লিজ বাতিল করে উচ্ছেদ করে দেন তিনি। এমনকি
গত বছর নভেম্বর মাসের দিকে সিলেট ও সৈয়দপুর বিমানবন্দর হতে একজন নারী উদ্যোক্তা কে হেনেস্থা, অপমান- অপদস্ত এবং জোর পূর্বক কোন কারন ছাড়াই কোটি- কোটি টাকার বিনিয়োগকৃত তিনটি ব্যাবসা কার্যক্রম মেম্বার অপরেশনস সাঈদ মোহবুব খান নিজ বেবিচকের নিজ দপ্তরে বসে উক্ত দপ্তরের উপ – পরিচালক আখতার হোসেন এর ফোনের নির্দেশনায় দুটি বিমানবন্দরের কিছু কর্মচারিদের দিয়ে সকল মালামাল সরিয়ে দেয়া হয়।
সেসময় উক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক হাসিনা আহমেদ বা মালিক পক্ষের কোন প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলো না। পরে ওই নারী উদ্যোক্তা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেয়। মন্ত্রণালয় থেকে এর ব্যাথ্যা চাইলে তিনি তার তার ব্যাখ্যা দেননি।
বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে গেলে পূনঃ লিজ বন্ধ হয়ে যায়। যা বর্তমান সময় চলমান রয়েছে। অথচ এই খাত থেকে বেবিচক কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসকল কর্মকর্তারা বেবিচকের তথা দেশের এতবড় মেগা প্রজেক্টকে বার বার বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন ও সেটি চালু হতে দেননি তাদের রেখে দিয়ে কতটা সফলভাবে থার্ড টার্মিনাল চালু হবে সেটি নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।
যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন সেহেতু তিনি সতর্কদৃষ্টি রাখলেই এটি পূর্ণাঙ্গতা আসবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, বর্তমান প্রশাসন দিয়ে থার্ড টার্মিনাল চালু করা যাবে কি না তা নিয়ে আমার নিজেরও যথেস্ট আশঙ্কা রয়েছে । এডিসির সঙ্গে যে প্রশাসন আলোচনা করে ফলাফল আনতে পারেনি উল্টো আমাদেরই বিশাল অঙ্কের টাকার খড়গ চেপে বসেছে। সেই কর্মকর্তারা আবারো আলোচনায় বসে কতটুকু সফলতা আনতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার যদি আন্তমন্ত্রণালয় একটি কমিটি করে সেখানে দক্ষ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে সেক্ষেত্রে একটি পজিটিভ রেজাল্ট আসতে পারে।
তিনি বলেন, জাপান কোরিয়া আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভালো রেজাল্ট আনতে পারতাম। কিন্তু অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে আমরা পারিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবকিছুর ক্ষেত্রেই বেবিচক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বেশ কয়েক বছর। এ কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কিছু উল্টা পাল্টা সিদ্ধান্তের কারণে এভিয়েশন খাতে আমাদের খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এক্ষেত্রে বিগত অন্তর্বতি সরকার বেবিচককে ভেঙ্গে একটি রেগুলোটারি ও অপারেটিভ দুটি বডি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখানে দক্ষ ও লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে এটি দ্রুত কার্যকর করলে এর অগ্রগতি সম্ভব।
তবে বেবিচকের সদস্য ( প্রশাসন ) এস এম লাবলুর রহমান বলেন, এটি মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা এখনো এ বিষয়ে কাজ শুরু করিনি। এখানে দুটি পার্ট একটি থার্ড টার্মিনাল চালু সেটা জাপানের সঙ্গে আলোচনা হবে। অন্যদিকে টাকা পয়সার পার্ট। আর টাকাটাই এখনই দিতে হবে এমন নয়। আমরা আলোচনা চালাবো। এখানে বেবিচকের একার কোন বিষয় নাই। অনেক স্টেকহোল্ডার আছে সবার সঙ্গে কথা বলে আমরা চেষ্টা করবো দ্রুত চালু করার।
এক প্রশ্নের বিষয়ে তিনি বলেন, আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির কিছু ফাইন্ডিংস আছে। আমরা সেটা নিয়ে কাজ করছি।
আর অন্যান্য যে সার্বিক বিষয়গুলো সেটা মন্ত্রণালয় দেখবে। মন্ত্রণালয় ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।



