বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির জন্য বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭ সাল) থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এর ফলে প্রত্যাশিত বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য শিশুদের আবারও সেই পুরোনো ভর্তির যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, শিশুদের বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে আবার পরীক্ষা হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে এবং কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দেবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যও বাড়তে পারে।
রবিবার জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছিলেন, বিগত সরকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করেছিল। তাঁর কাছে এটি খুব যুক্তিসংগত মনে হয়নি।
আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সবার অভিমত নিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তার একদিন পরেই গতকাল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানান, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন ‘আমরা লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলাম।’
এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকেরা শিশুদের ভর্তিতে পরীক্ষা হলে কোচিং বাণিজ্য ও ভর্তি বাণিজ্য শুরু হওয়াসহ নানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরে মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কার কথাও মন্ত্রীকে জানান সাংবাদিকেরা। প্রাথমিকে ভর্তিতে কোনোভাবেই পরীক্ষা নেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।
তারা বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো কোচিং বাণিজ্য চলে আসবে। আর এই ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো শিশুর মেধার যাচাই করা। এতে ফেল করা মানেই শিশুকে ‘ট্যাগ’ দেওয়া যে সে পারে না। এভাবে শিশুকে ট্রমার মধ্যে দেওয়া উচিত না।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ব্যাপক আলোচনার মধ্যে দিয়ে এটি করা হয়েছে। গত এক মাস ধরে পর্যালোচনা-আলোচনা করে এই বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তিনি বলেন, এমন কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না। প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা হবে। খুব সাধারণ পরীক্ষা নেওয়া হবে। তারপর দেখা যাক পরবর্তী ধাপে কি হবে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন তাঁরা ধীরে ধীরে ‘জোনিং সিস্টেম’ (এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয়ে পড়ার ব্যবস্থা) চালু করবেন।
একসময় বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নামে অল্প বয়সেই শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। কোচিং ও প্রাইভেট ছিল সাধারণ ঘটনা। অনেক পরিবার সন্তানদের নামী বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতো। পাশাপাশি ভর্তিকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল বিস্তর। ফলে সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নামকরা বা মোটামুটি ভালো বিদ্যালয়েও ভর্তি হওয়া প্রায় অধরাই থেকে যেত।
এ পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রথমে কেবল প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় (যেসব বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি রয়েছে) প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই পদ্ধতি চালু হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনো পরীক্ষার মাধ্যমেই হতো।
পরবর্তী সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম চলছে। তবে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা চালুর আলোচনা শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরোনো সমস্যাগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।
আর শিশু বয়সে মেধার তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা যৌক্তিক নয়। এতে বরং শিশুদের ওপর অযাচিত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কোচিং-নির্ভরতা বাড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে।



