মৃতপ্রায় জলপথের পুনর্জাগরণ : জিয়ার দর্শন থেকে তারেক রহমানের টেকসই অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় পানি ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা বরাবরই একটি মৌলিক প্রশ্ন। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও নদী, খাল ও জলাভূমির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ন, নদী ভরাট, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার ফলে বহু প্রাকৃতিক জলপথ আজ সংকুচিত বা মৃতপ্রায়।

যখন একটি নদী বা খাল তার প্রবাহ হারায়, তখন শুধু একটি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই হারিয়ে যায় না—থেমে যায় কৃষি উৎপাদন, কমে যায় মৎস্যসম্পদ, বাড়ে জলাবদ্ধতা, আর বিপন্ন হয় কোটি মানুষের জীবিকা।

এই বাস্তবতায় নদী-নালা-খাল পুনঃখননের উদ্যোগ কেবল একটি অবকাঠামোগত কর্মসূচি নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, জলবায়ু অভিযোজন, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ।

সম্প্রতি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল পুনঃখননের যে মহাকর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তা নতুন করে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়েই ৫৩টি জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা হ্রাস, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জলাধার সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু এই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে—অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিতে পেরেছি? বর্তমান উদ্যোগ কি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে?
বদ্বীপ বাস্তবতায় পানির কৌশলগত গুরুত্ব

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনন্য। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা বদ্বীপ অঞ্চলের অংশ। নদী ও জলাভূমিকে ঘিরেই এ দেশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবহন এবং স্থানীয় অর্থনীতি বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষি খাত মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ সরবরাহ করে। ফলে কৃষির সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

কিন্তু গত কয়েক দশকে নদী ও খাল ভরাট, জলাধার নষ্ট হওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে অনেক অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কৃষি সেচের প্রায় ৭৯ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আহরণ করা হয়—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি তথ্য। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে। রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনক হারে নিচে নেমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের কৃষি ও পানীয় জল সরবরাহের জন্য হুমকিস্বরূপ।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ৩০ বছরে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ নদ-নদী তাদের নাব্যতা হারিয়েছে। অনেক ছোট নদী ও খাল তো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে নদী ও খাল পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করতে পারে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ভিত্তি শক্তিশালী করবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা: জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গ্রামীণ উন্নয়ন ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে তিনি দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।

সেই সময় প্রায় ১,২০০ মাইল খাল খননের ফলে অতিরিক্ত প্রায় ৭ লাখ একর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসে। খাদ্যশস্য উৎপাদন ১ দশমিক ১ কোটি টন থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৫ কোটি টনে উন্নীত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বৃহৎ আকারের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ মডেল, যা গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল।

এই কর্মসূচির তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, শ্রমনির্ভর বাস্তবায়ন এবং পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগণ সরাসরি এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এভাবে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের অংশীদার হয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ‘লিভিং নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির প্রতিফলন বলে মনে করেন অনেকে।

তবে এই কর্মসূচির কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। অনেক এলাকায় খননকৃত খালের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা যায়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প অসমাপ্ত থেকে যায়। প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিও দেখা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের আগে খননকৃত খালের প্রায় ৫০ শতাংশ এখন আবার ভরাট হয়ে গেছে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, শুধু খাল খনন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। বর্তমান উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই শিক্ষাগুলো মনে রাখা জরুরি।
বর্তমান উদ্যোগ: ধারাবাহিকতা ও আধুনিক রূপান্তর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে অনেকেই অতীতের সেই উদ্যোগের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকায় প্রধানমন্ত্রী নিজে কোদাল হাতে খাল পুনঃখননের সূচনা করেন এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ করেন।

এই প্রতীকী উদ্যোগ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনকে তুলে ধরে—উন্নয়ন কেবল নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাস্তব কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া। কোদাল হাতে মাটি কাটার মধ্য দিয়ে তিনি শ্রমের মর্যাদা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কাজের গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন। খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতির প্রতীক।

তবে এই কর্মসূচির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের মতো একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতিমালা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয়, স্বচ্ছতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

প্রথম পর্যায়ে ৫৩টি জেলায় কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি জেলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে এবং কাজের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হবে এখনই—এই পরিকল্পনা কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটাই দেখার বিষয়।
সম্ভাবনা: কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রভাব

খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের সম্ভাব্য প্রভাব বহুমাত্রিক। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

কৃষি খাতে সম্ভাবনা: বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, সেচ সুবিধা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে কৃষি উৎপাদন গড়ে প্রায় ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পুনঃখনিত খালের মাধ্যমে পৃষ্ঠস্থ পানির সরবরাহ নিশ্চিত হলে কৃষকদের সেচ খরচ ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, সেখানে এটি বড় সুবিধা এনে দিতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) মতে, পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার মাত্র ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সেচ খরচ প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। এতে কৃষকদের নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে, যখন সেচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, তখন পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার কৃষকদের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।

মৎস্য খাতে সম্ভাবনা: খাল ও জলাধার পুনরুজ্জীবিত হলে স্থানীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, উন্মুক্ত জলাশয় ও খাল পুনরুদ্ধার দেশের স্থানীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়াবে। বর্তমানে উন্মুক্ত জলাশয়ে বার্ষিক প্রায় ১২ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়, যা পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে মৎস্য খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ: খাল পুনঃখনন কর্মসূচি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২-৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তৎপরবর্তী কৃষি ও মৎস্য কর্মকাণ্ডে আরও ৫-৭ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি বিশেষ করে প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের মৌসুমি বেকারত্ব দূর করতে সহায়ক হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা: কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়লে স্থানীয় বাজার, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবা খাতও গতিশীল হবে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক চক্র সৃষ্টি হতে পারে—উৎপাদন বাড়বে, আয় বাড়বে, ব্যয় বাড়বে, আরও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নদী, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলপথ সচল থাকলে:

বন্যা নিয়ন্ত্রণ: বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়, যা আকস্মিক বন্যা থেকে ফসল ও বসতি রক্ষা করে।

খরা মোকাবিলা: শুষ্ক মৌসুমে খাল ও জলাধারে সংরক্ষিত পানি কৃষি সেচে ব্যবহার করা যায়।

জলাবদ্ধতা নিরসন: নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হলে জলাবদ্ধতা কমে এবং ফসলের ক্ষতি রোধ হয়।

লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ: উপকূলীয় অঞ্চলে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়লে লবণাক্ততার প্রকোপ কমে।

বিশ্বজুড়ে এখন ‘প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান’ বা Nature-based Solutions ধারণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নদী পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুজ্জীবনকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) মতে, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার খরচ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ধারণা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। খাল পুনঃখননের পাশাপাশি খালের পাড়ে ফলদ ও বনজ বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ এই ধারণারই প্রতিফলন। এটি শুধু খালের পাড় ধস রোধ করবে না, স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখবে।
এসডিজি অর্জনে অবদান

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন খাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খাল পুনঃখনন কর্মসূচি সরাসরি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে:

লক্ষ্য ১ ও ২ (দারিদ্র্য ও ক্ষুধা মুক্তি): কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লক্ষ্য ৫ (লিঙ্গ সমতা): খাল পুনঃখনন ও তৎপরবর্তী কৃষি ও মৎস্য কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এটি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

লক্ষ্য ৬ (নিরাপদ পানি): ভূ-পৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণে সহায়তা করবে।

লক্ষ্য ৮ (কর্মসংস্থান): গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখবে।

লক্ষ্য ১৩ (জলবায়ু মোকাবিলা): জলাবদ্ধতা নিরসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

লক্ষ্য ১৫ (বাস্তুতন্ত্র): নদী ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের সফলতার হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ: বাস্তবতার নিরীক্ষা

সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা উপেক্ষা করলে কর্মসূচির সফলতা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়ে সেগুলো মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।

প্রথম চ্যালেঞ্জ: বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাব

খাল বা নদী পুনঃখননের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিত খনন অনেক সময় পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে বা স্থানীয় জলপ্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ খাল খনন প্রকল্প বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত ফলাফল দেয়নি।

প্রতিটি খালের হাইড্রোলজি, ভূপ্রকৃতি, মাটির ধরন, পানি প্রবাহের ধারা—এসব বিষয় বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। কোনো এলাকায় কত গভীরে খনন করা উচিত, কোন মৌসুমে খনন করা ভালো, খননকৃত মাটি কোথায় ফেলা হবে—এসব বিষয়ে প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদদের মতামত নেওয়া জরুরি।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: পলি ব্যবস্থাপনা

খননকৃত পলি বা মাটি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা কৃষিজমি বা জলাভূমির ক্ষতি করতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় দেখা গেছে, খননকৃত মাটি নদীর পাড়ে ফেলে রাখায় পরবর্তী বর্ষায় তা পুনরায় নদীতে ধসে পড়েছে। এভাবে খনন কাজ বৃথা হয়ে গেছে।

খননকৃত মাটি ব্যবহারের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এই মাটি কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা যেতে পারে, ইট তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে, অথবা নিচু এলাকা ভরাটে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এসবের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

বড় উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক তদারকি ছাড়া প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছানো কঠিন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামো খাতে দুর্নীতির কারণে প্রকল্প ব্যয় গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

এই প্রকল্প যাতে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয় সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জ: দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ

খাল পুনঃখনন একবারের কাজ নয়; নিয়মিত পরিচর্যা ছাড়া তা আবার ভরাট হয়ে যেতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ২০০০ সালের আগে খননকৃত খালের প্রায় ৫০ শতাংশ এখন আবার ভরাট হয়ে গেছে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।

তাই খাল পুনঃখননের পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্থানীয় ‘পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করে তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে (প্রকল্প ব্যয়ের কমপক্ষে ৫-১০ শতাংশ)।

পঞ্চম চ্যালেঞ্জ: অবৈধ দখল ও নিষ্কাশন

নদী ও খালের তীরবর্তী জমি অবৈধভাবে দখল করা একটি বড় সমস্যা। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যমতে, দেশের ৪০০টির বেশি নদীর তীরবর্তী প্রায় ৫০ হাজার একর জমি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। খাল পুনঃখননের পর পুনরায় দখল ও নিষ্কাশনের ঝুঁকি থাকে।

তাই খাল পুনঃখননের পর দখল প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। নদী ও খালের সীমানা স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণকে এসব জলপথ রক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশ একমাত্র দেশ নয় যে নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফলভাবে নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগতে পারে।

চীনের অভিজ্ঞতা: চীন গত দুই দশকে ইয়াংতসে নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি নদী খাল পুনঃখনন করেছে। এর ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং নদী অববাহিকায় কৃষি উৎপাদন ২৫ শতাংশ বেড়েছে। চীনের সাফল্যের মূল রহস্য ছিল—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন।

ভারতের অভিজ্ঞতা: ভারতের নর্মদা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এর ফলে ৫ লাখ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে, ২ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২-৩ মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতীয় অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে প্রকল্পের সফলতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা: নেদারল্যান্ডস ‘রুম ফর দ্য রিভার’ (Room for the River) প্রকল্পের আওতায় নদীগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে বন্যার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, নদী তীরবর্তী এলাকায় জীববৈচিত্র্য ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পর্যটন খাতে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই।

বাংলাদেশ এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজস্ব কৌশল তৈরি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন প্রাপ্তিতে উদ্যোগী হতে পারে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্ন

টেকসই উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; এটি সামাজিক ন্যায্যতা এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগণের মতামত, অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়ে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বহু প্রজন্ম ধরে নদী ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার যে লোকজ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে উন্নয়ন আরও কার্যকর হতে পারে। কৃষকেরা মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চাষাবাদ করতেন, জেলেরা নদীর প্রবাহ বুঝে মাছ ধরতেন, স্থানীয় কারিগরেরা পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদন করতেন। এসব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো জরুরি।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন:

ভূমিহীন কৃষকদের জন্য খালের পাড়ে ফলদ বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি।

মৎস্যজীবীদের জন্য মাছ চাষের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান।

নারীদের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পে সহায়তা।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের সফলতার হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই এই কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি প্রকল্পের সফলতার জন্যও জরুরি।
করণীয়: কিছু নীতিনির্ধারণী সুপারিশ

উপরোক্ত সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:

সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা: ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর সাথে বর্তমান খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে সমন্বিত করতে হবে। প্রতিটি খালের জন্য আলাদা হাইড্রোলজিক্যাল মডেল তৈরি করে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।

কার্যকর পলি ব্যবস্থাপনা: খননকৃত মাটি কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। খালের পাড়ে ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পলি ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কারিগরি নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।

স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল মনিটরিং: ড্রোন ও স্যাটেলাইট ইমেজিং ব্যবহার করে কাজের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি অনলাইনে প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজকে মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো: স্থানীয় ‘পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করতে হবে, যাতে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে (প্রকল্প ব্যয়ের কমপক্ষে ৫-১০ শতাংশ)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

অবৈধ দখল প্রতিরোধ: জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। খাল পুনঃখননের পর দখল প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। নদী ও খালের সীমানা স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণকে এসব জলপথ রক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে।

জন-অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণ: কেবল ঠিকাদারনির্ভর না হয়ে স্থানীয় শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় জনগণের লোকজ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থায়নের ব্যবস্থা: সরকারি বাজেটের পাশাপাশি উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে অর্থায়ন সংগ্রহ করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন তহবিল থেকে বরাদ্দ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে।

সক্ষমতা উন্নয়ন: স্থানীয় পর্যায়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নেতৃত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি একদিকে শহীদ জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন।

দিনাজপুরের কাহারোলে প্রধানমন্ত্রী নিজে কোদাল হাতে খাল পুনঃখননের সূচনা করেন। এটি একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা বহন করে—যে উন্নয়ন কেবল নীলনকশা ও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মাঠপর্যায়ে শ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। কোদাল হাতে মাটি কাটার মধ্য দিয়ে তিনি শ্রমের মর্যাদা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কাজের গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন। খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণও একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ, যা পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে।

তারেক রহমানের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা ‘রুট লেভেল’ বা তৃণমূলমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে দেখছেন। এটি জিয়াউর রহমানের উৎপাদনমুখী রাজনীতিরই এক আধুনিক রূপান্তর, যা প্রমাণ করে যে উন্নয়ন কেবল সুউচ্চ অট্টালিকা বা মেগা প্রকল্পকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়; বরং তা হতে হবে মানুষের মৌলিক চাহিদাকেন্দ্রিক।

তবে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
উপসংহার: টেকসই ভবিষ্যতের পথে

বাংলাদেশের মতো একটি বদ্বীপভিত্তিক দেশের জন্য নদী ও পানির সঠিক ব্যবস্থাপনাই টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। খাল পুনঃখনন উদ্যোগ যদি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

শহীদ জিয়া যে কোদাল দিয়ে স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিলেন, আজকের নেতৃত্বের হাতে সেই কোদাল আধুনিক ও টেকসই সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠেছে। নদী-নালা ও খালের প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া মানে বাংলাদেশের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া। স্বচ্ছতা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে, এই খাল খনন কর্মসূচিই বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব’ হয়ে উঠতে পারে।

অতীতের অভিজ্ঞতা যেমন আমাদের সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি সীমাবদ্ধতার দিকও স্মরণ করিয়ে দেয়। জিয়াউর রহমানের সময়ের উদ্যোগগুলো গ্রামীণ উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল, যদিও তার বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বর্তমান উদ্যোগ সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে পারলে এর সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তা মানুষ, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে একসঙ্গে বিবেচনা করবে। নদী ও খালের প্রবাহ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে এটি হতে পারে একটি মাইলফলক।

নদী ও খালের প্রবাহ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ সফল হোক—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা। কারণ মৃতপ্রায় জলপথের পুনর্জাগরণ মানেই বাংলাদেশের পুনর্জাগরণ। একটি সবল, সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথে এই উদ্যোগ যেন শুধু শুরু হয়, শেষ নয়।

আব্দুল্লাহ আল মামুন
আব্দুল্লাহ আল মামুন
আব্দুল্লাহ আল মামুন, পিএইচডি সহযোগী অধ্যাপক ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments