ধরলা পাড়ের ঝাঁকড়া চুলের কবি: কুড়িগ্রামে নজরুলের শতবর্ষী স্মৃতি

শিক্ষাবিদ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম বেবু কুড়িগ্রাম থেকে

​উনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তরবঙ্গের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং আধুনিক সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে এক ঐতিহাসিক আলোকস্তম্ভ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে তৎকালীন কুড়িগ্রাম হাইস্কুল (বর্তমান কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়)। তবে প্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষী ঐতিহ্যের একটি অন্যতম অধ্যায়—১৯২৪ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্ভাব্য কুড়িগ্রাম আগমন ও বিদ্যালয়ের বার্ষিক মিলাদ মাহফিলে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্য বনাম অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় এক গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনামূলক সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

​প্রাপ্ত তথ্য ও স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে (বাংলা ১৩৩৫ সালের ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী উপলক্ষে) কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের বার্ষিক মিলাদ মাহফিলে যোগদানের উদ্দেশ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুড়িগ্রামে যান। তখন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু ইন্দুভূষণ রায়। তিনি হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক পূজা এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক মিলাদ মাহফিলের সংহতিপূর্ণ আয়োজন করতেন। ওই সময়ে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র (পরবর্তীতে বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও পুস্তক প্রকাশক) মাহফুজার রহমান খানের নেতৃত্বে কবি নজরুলকে নিমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

​এর আগের বছরগুলোতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫–১৯৬৯), জমির উদ্দীন বিদ্যাবিনোদ (১৮৭০–১৯৩০), স্যার আজিজুল হক (১৮৯২–১৯৪৭) ও সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর (১৮৮০–১৯৩১) মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৪ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে প্রধান অতিথি করার প্রস্তাব গৃহীত হয়।

​স্থানীয় বিবরণ মতে, পর পর দুটি চিঠির পর কবি সম্মতি জ্ঞাপন করলে তাঁর নামে ৫০ টাকা যাতায়াত খরচ বাবদ টেলিগ্রাম মানিঅর্ডার করা হয়। পরবর্তীতে কবি রাত ৩টায় কলকাতা থেকে দার্জিলিং মেইলে পার্বতীপুর পৌঁছালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের ছাত্র মাহফুজার রহমান খান ও তার বন্ধু খেদমত উল্লাহ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। সেখান থেকে রংপুর হয়ে তিস্তা জংশন এবং ন্যারো গেজের ট্রেনে চেপে সকালে কুড়িগ্রামে পৌঁছান কবি।

‘​প্রগতিশীল শিক্ষাদর্শ ও ভৌগোলিক পেক্ষাপট’

​বৃহত্তর রংপুর জেলার তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমার শিক্ষিত সমাজ বিদ্যালয়টিকে ঘিরে এক আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তুলেছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আয়োজিত বার্ষিক মিলাদ মাহফিল কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমিত ছিল না; সেখানে ধর্মের উদার ব্যাখ্যা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আধুনিক শিক্ষাকে একসূত্রে বাঁধার প্রয়াস থাকত। এই প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলামকে অতিথি করা তৎকালীন প্রগতিশীল শিক্ষাদর্শেরই প্রতিফলন বলে গবেষকেরা মনে করেন।

​নজরুল স্মৃতির ভৌগোলিক পেক্ষাপট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন কুড়িগ্রামের ভাষা সৈনিক এ. কে. এম. সামিউল হক নান্টু। তিনি জানান, তাঁর নানা—বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ—১৯২৪ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুলের সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন।

​তিনি আরও স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৪৯ সালে তিনি যখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, তখন শহরের ঐতিহ্যবাহী মাধবরাম এলাকায় মূল স্কুল ভবনটি অবস্থিত ছিল—যেখানে কবি নজরুল আগমন করেছিলেন। পরবর্তীতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মূল স্কুল ভবনটি ধরলা নদীর নির্মম ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙনের পর স্কুলটি বর্তমান নতুন শহরে পুনঃস্থাপিত হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে এটি সরকারীকরণ লাভ করে।

​কুড়িগ্রামের স্থানীয় ইতিহাস ও স্মৃতিকথা অনুযায়ী তৎকালীন মহকুমার স্বনামধন্য ব্যক্তিগণ—যেমন তদানীন্তন চীফ হুইফ মিঞা আব্দুল হাফীজ, কাজী ইমদাদুল হক, নেহাল মিঞা এবং পানাউল্লাহ্‌—সেই সময়ের সামাজিক ও জ্ঞানচর্চার আবহে অত্যন্ত পরিচিত নাম ছিলেন।

‘​আতিথেয়তা ও প্রমত্তা ধরলার পাড়ে কবি’

​মাহফুজার রহমানের আদি বাড়ী ছিল মুন্সিগঞ্জ জেলায়, তবে কুড়িগ্রামে তার বাড়ি ছিল পুরাতন পোস্ট অফিসের পিছনে (পরবর্তীতে অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ বাহার খানের বাসা)। কবি নজরুল মাহফুজার রহমান খানের আতিথ্যে তার বাসায় দু’দিনের রাত্রি যাপন করেন।

​তিনি সন্ধ্যাবেলা প্রমত্তা ধরলা নদীর পাড়ে মাহফুজার রহমান, কাজী এনামুল হক ও অন্যান্য কয়েকজন ছাত্রসহ ঘাসের উপর বসে আলাপচারীতা করেন। ধরলায় তখন চখা-চখীর ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলার দৃশ্য ছিল মনোরম। কবি কুড়িগ্রামের নামকরণ ও এই স্থানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেন এবং ছাত্রদের কাছে তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। কবি যখন ধরলা পাড়ে বসে তাঁর চির উন্নত শির তুলে ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে কথা বলছিলেন, তখন পূর্ব দিগন্তে মাথা উঁচু করে তাঁকে যেন অভিবাদন জানাচ্ছিল আসামের তুড়া পাহাড়ের চূড়া।

​মাহফিল শেষে স্থানীয়দের অনুরোধে কবি সফরসূচি বৃদ্ধি করেন এবং পরদিন বিকেল ৪টায় কুড়িগ্রাম বাজার প্রাঙ্গণে এক বিশাল জনসভায় কংগ্রেস রাজনীতির সমর্থনে বক্তব্য দেন। এরপর উপস্থিত জনতার প্রবল তাগিদ ও করতালের মুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একের পর এক স্বরচিত বিপ্লবী ও প্রেরণামূলক গান পরিবেশন করেন।

‘​ইতিহাসের গঠনমূলক সমালোচনা ও নথির সংকট’

​ভৌগোলিক পরিবর্তন ও জোরালো প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থাকলেও, ইতিহাসচর্চার বৈজ্ঞানিক নীতি ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে এ সফরটি নিয়ে ইতিহাসবিদদের একাংশের মধ্যে সমান্তরাল সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

​গবেষকদের প্রধান সমালোচনা হলো, ১৯২৪ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুলে নজরুলের উপস্থিতির বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি প্রাথমিক লিখিত দলিল বা অকাট্য দাপ্তরিক তথ্যসূত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যালয়ের ১৯২৪ সালের রেজিস্টার খাতা, আনুষ্ঠানিক মিলাদ মাহফিলের মূল দাওয়াতপত্র, উপস্থিতি রেজিস্টার কিংবা তৎকালীন স্থানীয় administrations-এর নথিতে এ সফরসংক্রান্ত সুস্পষ্ট প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে।

​বিজ্ঞ গবেষকদের মতে, কাজী নজরুল ইসলাম ওই সময়ে কোনো অঞ্চলে সফর করলে সমকালীন সংবাদপত্র (যেমন—লাঙল, ধূমকেতু বা সওগাত) কিংবা সাহিত্যিক নিবন্ধে তা বিশদভাবে স্থান পেত। কুড়িগ্রাম সফর এবং সেখানে দেওয়া ভাষণের কোনো লিখিত ও যাচাইকৃত কপি সাহিত্যিক আর্কাইভে অনুপস্থিত থাকায় বিষয়টিকে অনেকে ঐতিহাসিক দলিলের বদলে ‘স্থানীয় মৌখিক ঐতিহ্য’ বা ‘জনশ্রুতিকথা’ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

​তবে তথ্যপ্রমাণের অসম্পূর্ণতা কাটিয়ে উঠে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠা করতে ভবিষ্যৎ গবেষকদের অনুসন্ধানের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পুরোনো নথিপত্র, আঞ্চলিক প্রাচীন পরিবারগুলোর ব্যক্তিগত সংগ্রহ, সমকালীন পত্রিকা ও সরকারি সংগ্রহাগার অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই স্মৃতিকথাকে শক্ত দালিলিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইতিহাস সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

‘​কুড়িগ্রাম হাইস্কুলে কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রদত্ত বক্তব্য (পূর্ণাঙ্গরূপ)

​(মাহফুজার রহমান খানের স্মৃতিকথা থেকে সংগৃহীত। কবি তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বক্তব্য প্রদান করেন এবং মাহফুজার রহমান খান তা লিপিবদ্ধ করে রাখেন।)’

​”উপস্থিত বিদ্যোৎসাহী ভদ্রমন্ডলীগণ ও আমার প্রিয় ছাত্র বন্ধুগণ,

​আপনাদের এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠের বিদ্যার্থীদের আয়োজিত বাৎসরিক মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান-উৎসবে, আমার ন্যায় সর্বগুণ বিবর্জিত ছন্নছাড়াকে ডেকে এনে কিছু বলার সুযোগ দেওয়ায় আমি মুগ্ধ। এ প্রকার উৎসব-অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে কিছু বলার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনে এই প্রথম। অবশ্য বক্তৃতা আমি করেছি অনেক জলসায়, অনেক দেশে, অনেক বড় বড় জনসমাগমে, কিন্তু সব বক্তৃতার বিষয়-বস্তু অন্য ধরনের। এই অনুষ্ঠানে আপনাদের মত বয়োজ্যেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণী ও উপস্থিত ওলামায়ে কেরামের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আপনাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে নতুন কিছু বলার মত এলেম আমার আয়ত্বে নেই বললেই চলে। পুঁজি আমার খুবই কম।

​গুণ আমার যতই থাকুক না কেন, স্নেহ ও প্রীতির বন্ধনে আমি হয়ে যাই মূঢ়, আমি হয়ে যাই বধির। আমার প্রতি আপনাদের অফুরন্ত আন্তরিকতা ও স্নেহ প্রীতির দরুণ পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে জানাচ্ছি হাজার শুকরিয়া, আর আপনাদেরকে জানাচ্ছি আমার হৃদয় নিংড়ানো সশ্রদ্ধ অভিবাদন। আপনারা আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

​এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহ। বিশ্বের যত জীব এবং যত বস্তু সবই তার সৃষ্টি। আল্লাহই সর্ব জীবের জন্য, মৃত্যু ও রেজেকের নিয়ন্তা। মানুষের চেয়ে অনেক বড় বড় জীব, জন্তু ও জানোয়ার তিনি সৃষ্টি করেছেন এই দুনিয়ায়—তবু ও মানুষকেই তিনি দান করেছেন শ্রেষ্ঠত্ব। তাই মানুষের আখ্যা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’।

​সর্ব জীব-শ্রেষ্ঠ মানুষের দায়িত্ব ও বহুমুখী এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইনসানের ইনসানিয়াতের পূর্ণ বিকাশের সহায়তার জন্য ধরায় অবতীর্ণ হয়েছে ঐশ্বরিক মহাবাণীর একত্র সমাবেশরূপে মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরান—পৃথিবীর শেষ মহানবী হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর মাধ্যমে। যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন কওমের মধ্যে নবীদের মারফত আরও ঐশ্বরিক মহাগ্রন্থ নাজেল হয়েছে, সে সবও মানবতার পূর্ণ বিকাশেরই জন্য। মানুষের সৎপথে চলার নির্দেশের জন্য।

​শ্বাশত সত্যই ধর্ম। এই “সত্য” কে খাঁটিভাবে উপলব্ধি করার জন্য আবহমান কাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গীর্জা, মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, বিহার ইত্যাদি সর্বপ্রকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। জীবশ্রেষ্ঠ মানুষের বিবেক বুদ্ধির পূর্ণ বিকাশের জন্য, জ্ঞান অর্জনের জন্য, আল্লার আদেশ ও নিষেধ বিশদরূপে জ্ঞান হবার জন্য, যুগে যুগে, পৃথিবীর সর্বত্র স্কুল, কলেজ, মক্তব, মাদ্রাসা, টোল, বিহার, পাঠাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রচুর প্রস্তুতি। সত্যের সন্ধান প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে আদিকাল হতে বিবর্তন ও সংস্কারের মাধ্যমে বর্তমান পৃথিবীর বহুমুখী ধর্মীয় ও শিক্ষা রীতির রূপায়ণ। পৃথিবীতে কত প্রকার ধর্ম যে প্রবর্তিত হয়েছে, তার শুমার করা কঠিন। আদিকাল থেকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কওমের মধ্যে উপাসনার যে রীতিই প্রচলিত থাকুক না কেন, সবই মানুষের জীবনকে সুস্থ, সবল, শান্ত ও সর্ব প্রকারে সুন্দর রূপে গঠিত করে স্রষ্টা ও সৃষ্টির সাথে দৃঢ় যোগসূত্র রক্ষার জন্য এসবের অবতারণা। ইনসানের ইনসানিয়াতের পূর্ণতা লাভ না হওয়া পর্যন্ত, মানবতার পূর্ণ বিকাশ না হওয়া পর্যন্ত মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত আখ্যায় আখ্যায়িত হতে পারে না।

​মানবতার বিকাশের জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আর প্রখর বিবেককে শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য প্রয়োজন বিদ্যা-শিক্ষার। বিদ্যা অর্জন না হলে জ্ঞান অর্জন হবে না। জ্ঞান অর্জন না হলে মুক্ত বিবেক-বুদ্ধি গঠিত হবে না। সুদৃঢ় বিবেক-শক্তি-সম্পন্ন না হলে মানবতার পূর্ণ বিকাশ হতে পারে না। বিদ্যা শিক্ষার মারফত, এলেম হাসেলের মারফত, জ্ঞান অর্জিত হবে এটা সবাই বলে থাকেন সত্য, কিন্তু জ্ঞান কত প্রকার, এলেম কত প্রকার—এটাও চিন্তার বিষয়। এলেম আরবী শব্দ। এর ব্যাখ্যা নিয়েও একদল আলেম সম্প্রদায়ের সাথে মত বিরোধ রয়ে গেল। মানুষের সর্বপ্রকার জ্ঞান অর্জনের প্রথম সোপান হলো বিদ্যালয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আমাদের জ্ঞানের উন্মেষ। পৃথিবীর সর্বত্র জ্ঞান-ক্ষেত্র।

​দিগ্বিদিকে বিচিত্র রংয়ের মিছিল। একই মাঠে একই সময়ে নানা প্রকার ফসলের বিরাট সমারোহ, একই বাগিচায় বিভিন্ন গাছে কত প্রকার ফল ফুল। আলো আর আঁধারের প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা। বর্ষায় অযাচিত জল রাশির অপূর্ব আবর্তন। শীতের কুজ্‌ঝটিকা আর হিমেল বায়ু কোন নিঝুম পুরীতে লুকিয়ে থাকে। ঝড় আর বাদল এদের দেশ কোথায়? গ্রীষ্মের গরম আটকে থাকে কোথায়! বাতাসে ভর করে এক দেশের কথা আর এক দেশে কি করে যায়। ধরায় আদিকাল হতে কত মানুষ এলো—কত মানুষ গেলো। তারা কোথা হতে আসে আর কোথা যায়। কেনই বা আসা আর কেনই বা যাওয়া। কোথা হতে, কেমন করে, কে এসব নিয়ন্ত্রণ করে? আরও বহু অপরূপ জিজ্ঞাসা মাথা উঁচু করে দিগ্বিদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ-জিজ্ঞাসার সুস্থ সমাধান কোথায় নিহিত আছে? আকাশে গ্রহ আর নক্ষত্র নিকরকে ঝুলিয়ে রেখেছে—কেমন করে?

​সুদূরপ্রসারী অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে এই সব মহা-জিজ্ঞাসার সত্য সমাধান করার প্রকৌশলই হলো জ্ঞান। জ্ঞান যিনি হাসেল করেছেন, আয়ত্ব করেছেন, তিনিই জ্ঞানী। জ্ঞান অর্জনের কঠোর সাধনাই হলো এবাদত। স্বচ্ছ ও উদার দৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞানবান ব্যক্তিই উর্ধ্বে, অধঃ, জল, স্থলে সর্বত্র আল্লাহর নেয়ামত ও দানের মাহাত্ম মনে প্রাণে উপলব্ধি করতে পারেন। জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক বর্জিত মানুষ, চেতনা শক্তি থাকা সত্ত্বেও হয়ে থাকে চির স্থবির…। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে যে থাকে চির বঞ্চিত। ক্ষণস্থায়ী-মানুষ আমরা, সব সময় আমাদের জাগ্রত থাকতে হবে কখন মহাকালের ডাক এসে যায়।

​বহুদূরে এসে পড়েছি যে—খেয়াল বশতঃ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মিলাদ অনুষ্ঠান মাহফিল এটা। শিক্ষা সম্বন্ধে এবং বিবেক সম্বন্ধে আমাদের মহানবী কি নির্দেশ দিয়েছেন দেখা যাক। তিনি বলেছেন,—’বিদ্যা শিক্ষাও জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মানুষের জন্য অবশ্যকর্তব্য।’

​রসুলুল্লাহ তৎকালীন নও-মোসলেমদিগকে সুদূর মহাচীনে যেয়ে ‘এলেম’ শিক্ষা করতে, জ্ঞান অর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে চীনদেশে কোন জাতীয় ‘এলেম’ মশহুর ছিল? এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরাম কি বলতে চান? সাধারণ জ্ঞানে আমরা এটাই বুঝতে পারি যে ধর্মের প্রশ্ন নেই, দেশের প্রশ্ন নেই, জাতের প্রশ্ন নেই, ভাষার প্রশ্ন নেই, মানুষের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক, যা কিছু কল্যাণকর তাই গ্রহণ করতে হবে। উদার দৃষ্টি-ভঙ্গি নিয়ে, স্বচ্ছ দৃষ্টিতে জ্ঞান আহরণ করতে হবে।

​রাজ্য শাসন ব্যাপারে আমাদের নবী তাঁর অন্যতম আসহাব আল মোয়াজকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা যাঁরা জ্ঞাত আছেন—তারা ভালভাবেই জানেন, মানুষের বিবেক শক্তিকে তিনি কত উচ্চে স্থান দিয়ে গেছেন।

​আমাদের বহুল প্রচলিত তিনটি বিদেশী শব্দ—এলেম, আলেম ও এবাদত। এর বাংলা প্রতি শব্দ দাঁড়ায় জ্ঞান, জ্ঞানী ও সাধনা। ছাত্র-জীবন সাধনার জীবন। এই সাধনার মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জন করতে হবে, জ্ঞানী হ’তে হবে।

​এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে,—আমাদের নবীর নির্দেশ মোতাবেক যদি আমার ছাত্র বন্ধুগণ বিদ্যা শিক্ষার ও জ্ঞান অর্জনের এবাদতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেন—তবেই আজকের এই মিলাদুন্নবী উৎসব অনুষ্ঠান সাফল্যমন্ডিত হবে। জয়যুক্ত হবে মনুষ্যত্বের পূর্ণ-বিকাশ, সার্থক হ’বে আশরাফুল মাখলুকাত আখ্যা।

​বন্ধুগণ, আপনারা এতক্ষণ আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে ধৈর্য সহকারে আমার বক্তব্য শ্রবণ করার জন্য আপনাদের নিকট আমি কৃতজ্ঞ। আপনাদের নিকট আমি নূতন করে কিছু বলতে পারিনি—এটা ভাল ভাবেই জানি। আজকার বক্তব্য হলো শিক্ষা বিষয়ক। আমার বলা তাই রয়েছে সীমাবদ্ধ। আমি নিজে অশিক্ষিত হিসেবে শিক্ষা বিষয়ে যা উপলব্ধি করতে পেরেছি তাই শুধু আপনাদের কাছে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। অভিজ্ঞ আপনারা এবং ছাত্র বন্ধুগণ আমার বক্তব্য বিষয়ে সামান্য মাত্র যদি আনন্দ পেয়ে থাকেন তবেই আমি ধন্য। আবার আপনাদেরকে মোবারকবাদ জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি। আপনারা আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন গ্রহণ করুন।”

​তথ্যসূত্র: ড. রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত “নজরুল স্মৃতিচারণ” (পৃষ্ঠা: ১৬৩–২২১) এবং মাহফুজার রহমান রচিত প্রবন্ধ “কুড়িগ্রামে কবি নজরুল ও নজরুলের সন্নিধান”।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments