সংসদে সাউন্ড সিস্টেমে গোলযোগ, সংসদ কমিটির সন্দেহ ‘সাবোটাজ’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে শব্দযন্ত্রে ব্যাপক গোলযোগ, এমনকি খোদ স্পিকারের মাইক কাজ না করার পেছনে সাবোটাজ (অন্তর্ঘাতমূলক) রয়েছে বলে সন্দেহ করছে জাতীয় সংসদের সংসদ কমিটি।

সাবোটাজ ছিল কিনা তা তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শব্দযন্ত্রের সমস্যা সমাধানে কী করা যায়, সে বিষয়েও সুপারিশ দেবে কমিটি। শনিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদের সংসদ কমিটির প্রথম বৈঠকে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

বৈঠক শেষে সংসদ কমিটির সভাপতি ও সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, তারা (কমিটি) ধারণা করেন এখানে একটা সাবোটাজ হয়েছে। ওই ঘটনা তদন্ত করার জন্য সার্জেন্ট এ্যাট আর্মসের (সংসদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা সংস্থা) নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, আসলেই সাউন্ড সিস্টেমের যে সমস্যা আছে, তা দেখার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

তিনি জানান, তদন্ত কমিটি প্রধানত দুটো বিষয় দেখবে। প্রথমত, এখানে কোনো সাবোটাজ হয়েছে কিনা। দ্বিতীয়ত- সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা কী, তার সমাধান কীভাবে করা যায়। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংসদ কমিটির সভাপতি বলেন, হেডফোন নিয়ে সবার অভিযোগ আছে। আমার নিজেরও অভিযোগ আছে। এত বড় ঢাউস একটা হেডফোন মাথায় দিয়ে মাথা, কান গরম হয়ে যায়। এই হেডফোন পরিবর্তন করা হবে।

৫ আগস্টের পরে সংস্কারের জন্য অনেক সময় পাওয়া গেলেও কি কারণে ঠিকমত সমস্যার সমাধান করা যায়নি এমন প্রশ্নে চিফ হুইপ বলেন, ৫ আগস্টের পরে দেশে নির্বাচন হবে না- এমন একটা আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল।

তারপর আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল এরকম হবে, সেরকম হবে। নির্বাচনের দিনেও আমাকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল নির্বাচন কি ফাইনালি টিকবে? আমি বলেছি, দেখা যাক। আমরা বলতে পারব না, চেষ্টা করি; যাতে টিকে।

প্রসঙ্গত, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই অধিবেশনকক্ষে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাটের কারণে অধিবেশন কিছু সময় বন্ধ রাখতে হয়। ১৫ মার্চ অধিবেশনের দ্বিতীয় বৈঠকেও হেডফোন ও সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতের এমপি শাহজাহান চৌধুরী।

ওইদিন সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, একটা বাজেট করে ওখান থেকে লুটপাট বাহিনীরা একটা বিল করে খাওয়ার জন্য এব্যবস্থা করেছে। আমাদের হাউসে সাউন্ড সিস্টেমটা…আমরা তো আরো দুইবার সংসদে এসেছি, আপনিও এসেছেন, কিন্তু এতবড় একটা বোঝা মাথার ওপর দিয়ে এক-দুই ঘণ্টা বসা সবার জন্য কষ্টকর হচ্ছে। এসময় তিনি হেডফোন কান থেকে হাতে নিয়ে দেখান।

তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের সংসদে এটা ছাড়াই সংসদ চালিয়েছি। ২০০১ সালেও চারদলীয় সরকারের সময়েও হয়েছে। এখন এত বড় বোঝা…এটা মনে হয় একটা বাজেট করেছিল, আর ওখান থেকে লুটপাট বাহিনীরা একটা বিল করে খাওয়ার জন্য এ ব্যবস্থাটা করেছে। এত বড় বোঝার প্রয়োজন নেই। তিনি সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ভালো করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাতে একটি সাধারণ হেডফোন বা হেডফোন ছাড়াও সংসদ সদস্যরা যেন শব্দ শুনতে পান।

১০ এপ্রিলের মধ্যে এমপিদের বাসা বরাদ্দ, কেনা হচ্ছে নতুন আসবাব
সংসদ কমিটির বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সংসদ সদস্যদের আবাসন ও চিকিৎসাসুবিধা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। মোটামুটি সব সংসদ সদস্য আবাসনসুবিধা পাবেন।

স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, চিপ হুইপ ও হুইপ- তাদের জন্য আলাদা বাসভবনের ব্যবস্থা আছে। বাকি সংসদ সদস্যদের সবার আবাসনের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাটগুলোয় প্রয়োজনীয় যেসব জিনিস কিনতে হবে, সেগুলো কেনা সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের আবাসন ভবনের আসবাবপত্র দ্রুত প্রস্তুত, মেরামত ও সংস্কারের নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং প্রতিটি আসবাবপত্রের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে সংসদ সদস্যদের বাসা বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আগামীকাল সোমবার আবার বৈঠক করবে সংসদ কমিটি।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নাখালপাড়ায় অবস্থিত সংসদ সদস্য ভবনের সংস্কার ও মেরামত কাজের অগ্রগতি, শেরে-ই-বাংলা নগরে অবস্থিত এমপি হোস্টেলের ১৫৬টি অফিস কক্ষ সংস্কার এবং সিভিল, ই/এম ও কাঠের কারখানা বিভাগের কার্যক্রমও গতকালের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়।

সংসদের মেডিকেল সেন্টারের জন্য আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ ও লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি কেনার সুপারিশ। সংসদ ভবনের মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন এবং চিকিৎসা সেবার পরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু সুপারিশ করেছে সংসদ কমিটি।

মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন, বিশেষ করে কার্ডিয়াক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন, আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়, আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ, লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি কেনা এবং স্বনামধন্য কোম্পানি থেকে মানসম্মত ওষুধ কেনার উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের জন্য ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল সেন্টারে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও মেডিকেল অফিসার পদায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একইসঙ্গে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নাখালপাড়ার ফ্ল্যাটসমূহে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং নির্ধারিত জনবল পূর্বের রেওয়াজ অনুযায়ী সদস্য ভবন শাখায় পদায়নের বিষয়েও আলোচনা হয় কমিটি প্রথম এই বৈঠকে।

কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ কমিটির বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য- রকিবুল ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, শহিদুল ইসলাম, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, সাইফুল আলম ও আবুল হাসনাত।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments