একদিকে সিলেটে বজ্র বৃষ্টি অব্যাহত, অন্যদিকে শত শত পাম্প লাগিয়ে হাওরের জলাব্ধতা নিরসনের প্রণান্তকর চেষ্টা চলছে। এ যেন প্রকৃতির সাথে কৃষকের এক যুদ্ধ। শুক্রবারও রাতের প্রচুর বজ্র-বৃষ্টি সিলেটবাসীর মনে আতংক ধরিয়ে দিলেও খাদ্য রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা থেমে নেই বটে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, জামালগঞ্জের বিভিন্ন হাওর পারে শত শত সেচ মেশিন লাগিয়ে বৃষ্টির পানি বের করা হচ্ছে। এসব সেচ পাম্পে ১ লাখ টাকার সহয়তা প্রদান করেছেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরু। তিনি বিভিন্ন হাওর ঘুওে অবস্থা পরিদর্শন করছেন। তবে কোন কোন স্থানে হাওর রক্ষা বাঁধ কেটে দেয়া হয়েছে পানি নিষ্কাষনের জন্য।

এদিকে আবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডাকুয়ার হাওরের ‘হাওর রক্ষা’ বাঁধ কেটে দিয়েছেন এলাকার শতাধিক লোক। ডাকুয়ার হাওর ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় শনিবার দুপুরে তারা বাঁধ কেটে দেন। বাঁধ কাটতে বাধা দেওয়ায় স্থানীয় লোকজনের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে।
অন্যদিকে হাওরের বোরো ধান নিয়ে মাতামতির ঢেউ খোদ সিলেট বিভাগীয় নগরীতে এসে লেগেছে। শনিবার বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্টিত মানবব্ধনে বক্তরা হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে দুপুরে দিরাই উপজেলা সদরেও গণ-সমাবেশ করেছে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’, দিরাই উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বোরো মৌসুমে অনাহুত পানি জমতে দেয়া যাবে না। আবার পাহাড়ি ঢল যাতে হাওরে ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। কৃষকদের অভিজ্ঞতা, কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে হাওর ব্যবস্থাপনায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
তারা বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের দ্রুত তালিকা তৈরী করে তাদেরকে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। বক্তারা হাওরের জলাবদ্ধতা, পাহাড়ী ঢল মোকাবেলায় ব্যাপক ভিত্তিতে নদী খনন, খাল পুনঃখনন সহ হাওর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরী বলে মন্তব্য করেছেন।
‘পোহাস’-র মানব বন্ধন:
হাওরের ফসল রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের দাবিতে সিলেটে ‘পোহাস’ মানববন্ধন করেছে শনিবার। পোহাস হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ জানয়েছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা (পোহাস) আয়োজিত মানববন্ধনে সিলেটের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, কৃষক প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা অংশগ্রহণ করেন।
এতে লিখিত বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও উন্নয়ন সংস্থা সভাপতি কাসমির রেজা। সাধারণ স¤পাদক পিযুষ পুরকায়স্থ টিটুর সঞ্চালনায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা- সিলেট এর সভাপতি জামিল আহমেদ চৌধুরী, সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, ব্লাস্ট সিলেট এর সাবেক কোঅর্ডিনেটর এডভোকেট ইরফানুজ্জামান, মধ্যনগর উপজেলা উন্নয়ন পরিষদের সাবেক সভাপতি মোঃ আমিনুল ইসলাম, ধর্মপাশার রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমানুর রাজা চৌধুরী প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে কাসমির রেজা বলেন, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সুনামগঞ্জের ১২ টি উপজেলায় অর্ধশত হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির তলে, কাঁচা ধান গাছে পচন ধরেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, আমরা কোন অবস্থায় ফসলের ক্ষতি দেখতে চাই না। বক্তরা বলেন কৃষকরা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন। বৃষ্টির পানিতে শুধু ফসলই নয়, গবাদিপশুর খাদ্য সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে। তারা এখন দিশেহারা।
তারা বলেন, প্রতিবছর অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে হাওর রক্ষায় অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হলেও এর বাইরে কোনো পরিকল্পনা দেখিনা। হাওরের বাঁধ এখন অনেক ক্ষেত্রে মরণ ফাঁদ। কৃষকরা হাওরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে “ইসগেট স্থাপন ও পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসলেও তা হচ্ছে না।
তাহিরপুর উপজেলার টাক্সগুয়ার হাওর পাখিমারা হাওড়, দেখার হাওড়, করচার হাওড়, কানলার হাওড়, খাই হাওড়, শাল্লার ছায়ার হাওড়, জামালগঞ্জের হালির হাওড়, পাগনার হাওড়, তাহিরপুরের শনির হাওড়, মাটিয়ান হাওড়সহ , দিরাই উপজেলার কালিকোটা, টাংনি, হুরামন্দিরা, বরাম ও চাপতির হাওরের, মধ্যনগরের ঠগার হাওর,শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর, সাংহাই হাওর, খাই হাওর, জামখলা হাওর ও কাঁচিভাঙা হাওরের নিচু জমিগুলোও পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
কালভার্টের মুখে বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ:
বালিজুরী গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত বায়রাগাঙ নামে পরিচিত ছোট নদীর কালভার্টের মুখে বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ দেওয়াকে কেন্দ্র করে টগার হাওর ও শৈলচাপড়া হাওরের কৃষকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। উপজেলা
প্রশাসন সূত্র জানায়, টগার হাওরে প্রায় ২ হাজার ৩৪০ হেক্টর এবং শৈলচাপড়া হাওরে প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে চাষকৃত বোরো ধানে জলাবদ্ধতার কারণে দুই হাওরের কৃষকদের মধ্যে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে।
নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বৃষ্টির পানি কালিজানা নদী হয়ে ধর্মপাশা উপজেলার শৈলচাপড়া হাওরে প্রবেশ করে। এরপর সেই পানি পাইকুরাটি ইউনিয়নের বালিজুরী গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত বায়রাগাঙ হয়ে টগার হাওরে ঢুকে। এতে টগার হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় টগার হাওরের কৃষকরা বায়রা গাঙের কালভার্টের মুখে বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ বন্ধ করে দেন। কৃষকরা জানান, বাঁধ দেওয়ার ফলে শৈলচাপড়া হাওরের পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হবে । জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে।
সেখানের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায়, পাইকুরাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক, সেলবরষ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ফরিদ খোকা, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রশান্ত বিশ্বশর্মা, উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানালেন, সমস্যা সমাধানে কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



