গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি অবস্থানের প্রতিবাদ ও তা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট প্রাঙ্গণে মিছিল পূর্ব বিশাল সমাবেশে নেতারা বলেছেন,সংস্কার এবং গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নিবাচনে বিজয়ী হয়েই গণভোট এবং জুলাই সনদ প্রশ্নে নিজেদের ‘রূপ’ পাল্টে ফেলেছে বিএনপি।
এ সময় জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) -সহ জোটের শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি দেন,ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে গেলে অতীত সরকারের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে বিএনপিকে। যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছেন,তারাই আজ গণভোটকে অস্বীকার করছেন। দেশের মানুষ কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না।
বিএনপি যে পথ বেছে নিয়েছে, সেটি ফ্যাসিবাদের পথ। আমরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। জনরায় মানতে বাধ্য করার আন্দোলন আমরা শুরু করলাম।
সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররম থেকে নাইটিঙ্গেল মোড় হয়ে কাকরাইল পর্যন্ত জুলাই সনদের পক্ষে ব্যানার-প্লাকার্ড নিয়ে বিশাল মিছিল করেছেন তারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটাই বিরোধী জোটের প্রথম কোনো সরকার বিরোধী বড় বিক্ষোভ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা কর্মীদের খÐ খÐ মিছিল নিয়ে যোগ দিতে দেখা গেছে।
এ সময় তারা গণভোটের পক্ষে বিভিন্ন ¯েøাগান দিতে থাকেন। তাদের হাতে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই’; ‘গণভোট মানতে হবে’ প্রভৃতি লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি’র সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াত সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আযাদ,খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান,জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান,জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন প্রমুখ। বক্তারা তেল সংকট ও হাম সংক্রমণ রোধে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন।
এটিএম আজহারুল ইসলাম রাজপথের আন্দোলনে বাধ্য না করতে সরকারের প্রতি আহŸান জানিয়ে বলেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব একটি দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে আরেকটি দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ছিল না। জুলাই বিপ্লব ছিল পুরাতন ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলা এবং নতুন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য। ১৬ বছর এক ব্যক্তির শাসন দেখা হয়েছে, মানুষ আর ওই ব্যবস্থায় ফিরতে চায় না। শুধুমাত্র ক্ষমতার হাত বদলের জন্যই জুলাই বিপ্লব হয়নি বরং রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সুশাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে।
এটিএম আজহার বলেন, জুলাই সনদ জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতের প্রণীত হয়েছে। এজন্য দীর্ঘ সময় সকল রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলে তা প্রস্তুত করা হয়েছে। একই অর্ডারে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও শুধু গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। যা সরকারের আদর্শিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছু নয়। মূলত, পতিতদের আদলে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার হীন মানসিকতা থেকেই সরকার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন দুই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তার একটি মুনাফিকি আর একটি সুবিধাবাদ। গ্রামবাংলায় একটি গল্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এক মা তার ছেলে আর মেয়ের জামাতা বিষয়ে বলছে-আমার ছেলেটা খারাপ কারণ সে শাশুড়ির কথা শোনে, মেয়েটা ভালো কারণ সে আমার কথা শোনে।
তিনি বলেন, বিএনপির এই সুবিধাবাদের রোগ হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে অধ্যাদেশগুলো তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করে তা তাদের কাছে খুব পছন্দনীয়। আর যে অধ্যাদেশগুলো জাতির কাছে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, তা অপছন্দনীয়। আমরা মনে করি, বিএনপি যে রাজনীতি করছে সেটা সুবিধাবাদের রাজনীতি।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমরা নির্বাচনের সময় দেখেছি, বিএনপি সারা দেশে তলে তলে না-এর পক্ষে প্রচার করেছে। জনরোষের ভয়ে প্রকাশ্যে বলার সৎ সাহস তাদের ছিল না। এজন্য লাখো মানুষের সামনে বিএনপি প্রধান জনাব তারেক রহমান হ্যাঁ-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রকাশ্যে এক কথা, ভেতরে অন্য কথাকে কী বলে? মুনাফিকি।তিনি আরও বলেন, এ দেশের জনগণকে যদি হাইকোর্ট দেখান, রাজপথে জবাব দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। ৭০ পার্সেন্ট জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। অতীতে আপনাদের অপকর্মের কারণে দেশের দেশপ্রেমিক দলগুলোকে খেসারত দিতে হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) সদস্যসচিব আখতার হোসেন তার বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের আগে একাধিক বৈঠকে বিএনপি গণভোট ও জুলাই সনদ বিষয়ে শতভাগ একমত পোষণ করেছিলো। গণভোট ও জুলাই সনদ প্রশ্নে বিএনপি নেতারা তখন বারবার বিষয়গুলোর স্বপক্ষে নিজেদের মতামত প্রকাশ্য সমাবেশে বলেছেন। এরপরও নির্বাচনের যেতে না যেতেই এই দুই গুরুত্বপূর্ণ এবং জনসমর্থিত বিষয়ে বিএনপির গড়িমসি নিঃসন্দেহে দলটির ক্ষমতাকেন্দ্রীক লোভী মনবৃত্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
আখতার হোসেন বলেন,আমরা সংস্কার পরিষদের কথা বলেছি, এটা নতুন কিছু নয়। ঐক্যমত কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের টেকসই পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কারের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল এক হয়েছিলাম।তিনি অভিযোগ করেন,ভোটের পর তারা টু-থার্ড মেজরিটি পাওয়ার জন্য জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তারা সংবিধানের কথা বলে, আমরাও মানি দেশ পরিচালনায় সংবিধান প্রয়োজন। কিন্তু সেটি ৭২-এর মুজিববাদী সংবিধান নয়, বরং হতে হবে জনগণের সংবিধান।
সরকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন,আপনারা সংস্কার বা গণভোট চান না, কারণ আপনারা বাংলাদেশকে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। গণভোট মেনে নিলে আপনাদের একক কর্তৃত্ব থাকবে না। তাই আপনারা মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তনও চান না। কিন্তু জনগণের মতামত অমান্য করে কোনোভাবেই টিকে থাকা সম্ভব নয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১২ ফেব্রæয়ারি নির্বাচন কমিশনের একই তফসিলের অধীনে দুটি নির্বাচন হয়েছে। জনগণ দুটি ভোট দিয়েছে। একটি জাতীয় সংসদ গঠনের; অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার বাস্তবায়নের। নির্বাচনের পরে ইসিই নির্বাচিতদের শপথপাঠের জন্য দুটি শপথনামা সরবরাহ করেছে। কিন্তু বিএনপি সুকৌশলে সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি।
বিএনপির এই অবস্থান গণভোটকে অবজ্ঞা ও জাতিকে অবমাননা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ সরকার বাদ দিয়ে সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের কবর রচনা করেছে। এখন তারা পাঁয়তারা করছে সংস্কার না করে সংশোধনী বিল আনার। সংবিধান সংশোধন সংসদের একটি রুটিন কাজ। এটি করার জন্য জুলাই বিপ্লব বা গণভোট হয়নি। সংস্কারকে এড়িয়ে আবার ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চাইলে ইতিহাস থেকে সবক নেওয়ার পরামর্শ দেন হামিদুর রহমান আযাদ।
সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে সবক নেন। সেই পরিণতি আপনাদেরও ভোগ করতে হবে। যতক্ষণ পূর্ণ সংস্কার আদায় না হবে ততক্ষণ আমরা রাজপথ ছাড়ব না। জামায়াত নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা কি সংবিধান সংশোধনের জন্য রাস্তায় নেমেছিলাম, নাকি সংস্কারের জন্য? বিএনপি যে প্রতারণার রাজনীতি শুরু করেছে, তার মাসুল তাদেরকে দিতে হবে। জনগণের রায়কে প্রত্যাখ্যান করলে, জনগণও তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করবে।
আহমদ আবদুল কাদের বলেন, যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছেন, তারাই আজ গণভোটকে অস্বীকার করছেন। দেশের মানুষ কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না। বিএনপি যে পথ বেছে নিয়েছে, সেটি ফ্যাসিবাদের পথ। আমরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। জনরায় মানতে বাধ্য করার আন্দোলন আমরা শুরু করলাম।



