কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না অনলাইন জুয়া

বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনলাইন বেটিং বা জুয়ার বিজ্ঞাপন চলছে। লোভনীয় অফার। প্রথম দফায় ফ্রিতে গ্রাহক হওয়ার পর পরপর কয়েকটি গেমে জয়ী হয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের একাউন্টে কয়েক হাজার টাকা জমা হয়। আবারও শুরু হয় লোভনীয় অফার। এবার একটিতে জিতলে দ্বিগুন লাভ। পরেরটিতে জিতলে ৩ টি ফ্রি গেম খেলার অফার।

এরকম অনলাইন জুয়া শুধু শহরে নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়ান এক্স বেট, বেট থ্রি-সিক্সটি-ফাইভ, মোস্ট বেট বিডি, ৯ উইকেটসসহ শত শত জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন হাতের এনড্রয়েট মোবাইল ফোনসেটে দেখা যাবে।

ফুটপাতের চা দোকানি থেকে শুরু করে সেলুন দোকানদার, হকার, বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী, বিক্রয় কর্মী থেকে শুরু করে ভবঘুরে, বাস-ট্রাকের চালক-হেলপার, সিএনজি চালক, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, রিকশাচালক ও দিনমজুর শ্রেণীর মত একেবারে নি¤œ আয়ের মানুষ এখন দিনের একটা সময় অনলাইনে বাজি ধরতেই ব্যস্ত থাকে।

অনলাইনে বেটিং ধরতে গিয়ে প্রথমে তিন হাজার পরে পাঁচ হাজার টাকা মোবাইল ব্যংকিংয়ের মাধ্যমে ধরা হয়। এরপর আসক্তি বাড়লে ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত চলে যায়। আর এভাবেই টাকা শেষ হতে থাকে। পাঁচ-দশ হাজার টাকার বিনিয়োগে শুরু করে লোভে পড়ে একপর্যায়ে খোয়াচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

জুয়ার এসব সাইটের অধিকাংশ পরিচালনা করা হচ্ছে রাশিয়া, ফিলিপাইন, ম্যাকাও, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, আজারবাইজান, বেলারুশ, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে। বিদেশ থেকে পরিচালিত এসব সাইট পরিচালনা করছে বাংলাদেশের এজেন্টরা। জুয়ায় বিনিয়োগ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই জুয়ার সাইটগুলো বন্ধ করি। এক্ষেত্রে আমরা নিরাপত্তা বাহিনী ও সইবার নিরাপত্তা এজেন্সীকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তারা আমাদের কাছে যে তালিকাগুলো পাঠায় সেগুলো তাৎক্ষনিকভাবে বন্ধ করা হয়। পাশাপাশি অনলাইন জুয়া নিয়ে নিয়ে আমরা গত দুই তিন মাসে অনেকগুলো বৈঠক করেছি। সেখানে নতুন নতুন যে সাইটগুলো আসছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ও বাংলাদেশ বাংকের সঙ্গেও বৈঠক করেছি। আমরা চেষ্টা করছি, টাকার ফ্লো বন্ধ করার জন্য। এক্ষেত্রে একট সমস্যা হচ্ছে, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসগুলো এনআইডির সঙ্গে মোবাইল নম্বরের মিল আছে কিনা সেটা দেখতে পারে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসিকে যুক্ত করার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা হলে গেলে টাকার ফ্লোটা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কেউ চাইলেই অনলাইন জুয়ায় বিনিয়োগ করতে পারবে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক দেশে জুয়া খেলা বৈধ হলেও বাংলাদেশে অবৈধ। এ ধরনের জুয়ায় শত শত কোটি টাকা মোবাইল ফিন্যানসিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। এরপর যিনি জুয়ার অ্যাপসের বাংলাদেশের এজেন্ট, তিনি ওই টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েন করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনলাইন জুয়ার প্রথম ধাপের টাকা লেনদেন হয় বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের মাধ্যমে। এই এমএফএস সার্ভিসকে নজরদারির মধ্যে নিতে পারলে অনলাইন জুয়ার প্রভাব অনেকটা কমে যাবে।

অনলাইন জুয়া পরিচালনায় যুক্ত এক তরুণ জানান, জুয়া খেলতে গিয়ে এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। পরে যুক্ত হন জুয়া পরিচালনায়। এখন প্রতি মাসে তার আয় অন্তত লাখ টাকা। তার কাজ শুধু মোবাইল ফোনে একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করা। জুয়া পরিচালনা নেটওয়ার্কের এক সদস্য অপরজনের সঙ্গে ছদ্মনামে পরিচিত হন। যোগাযোগের জন্য তারা ভুয়া নিবন্ধনের সিমকার্ড ও বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করেন। ফলে চক্রের একজন ধরা পড়লেও অন্যদের শনাক্ত করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। সেইসঙ্গে তারা কিছুদিন পরপর অবস্থান বদলান। যেমন তার মূল অবস্থান রংপুর বিভাগে হলেও তিনি মাঝেমধ্যেই ঢাকা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে মাদক ও অনলাইন জুয়া থেকে যুবসমাজকে রক্ষার আহবান জানিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো অনলাইন জুয়া প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জুয়া, বেটিং ও পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন ও প্রোমোশনাল কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এরপর থেকে অনলাইন জুয়ায় জড়িত মোবাইল নম্বর ও এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের পর বøক করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে অনলাইন বেটিংয়ে জড়িত ফোন নম্বরের ইন্টারনেট গতি সীমিত করার বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে বিটিআরসি। ইতিমধ্যে জুয়ায় জড়িত প্রায় ৫ হাজার এমএফএস হিসাব ফ্রিজ করে দিয়েছে।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এজেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, র‍্যাবের সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনলাইন জুয়ার ঘটনায় জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে র‍্যাব। র‍্যাবের সাইবার মনিটরিং শাখা অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ করে পুলিশ সদর দপ্তর, সিআইডি ও ডিবির সাইবার মনিটরিং শাখার সঙ্গে এক সঙ্গে কাজ করছে। র‍্যাব অনলাইন জুয়ার বিষয়টিকে বর্তমান যুবসমাজের এক নম্বর সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

সিআইডির ফাইভ সি (সাইবার ক্রাইম কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টার) শাখার প্রধান এডিশনাল ডিআইজি জাহিদ হাসান বলেন, অনলাইনে জুয়া পরিচালনা করার সাইট শনাক্ত করার পর সেটি সিআইডি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ২/১ দিন পর দেখা যায়, ওই সাইটের ঠিকানায় একটি ডট বসিয়ে আবারও পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে বেশ কিছু অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ করেছি। আর জুয়ার অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশে বেশ কয়েকটি এমএফএস একাউন্টও বন্ধ করেছি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments