কানে মোবাইল ফোন : পেছনে ধেয়ে আসছে লৌহদানব

দিন দিন বাড়ছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা। আর এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ সিংহভাগই অসতর্কতা আর মোবাইল ফোনে কথা বলা। বিগত সময় রেল কর্তৃপক্ষ ও রেল পুলিশ এ ধরনের ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনা কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তবে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সামাজিক ও সরকারিভাবে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ বুধবার (৮ এপ্রিল) রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকায় মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে স্বপন কুমার সরকার নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদিন জানান, স্বপন কুমার সপরিবার বগুড়ায় থাকতেন। কাজের প্রয়োজনে তিনি মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসতেন। বুধবার তিনি চুক্তিবদ্ধ ট্রাভেল এজেন্সির কাজে ঢাকায় এসেছিলেন। ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বপন কুমার মুঠোফোন কানে ধরে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হচ্ছিলেন। এ সময় কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু

হয়। উল্লেখ্য, এর আগে পাবনার ঈশ্বরদীতে কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ইমরান নামে এক যুবক।

রেলসূত্র জানায়, গত এক বছরে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল বিভাগে রেললাইনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬০০ জন। এরমধ্যে গত তিন মাসে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-জামালপুর রুটে ট্রেনে পড়ে মারা গেছে ২৫ জন। যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে ছাত্র থেকে শুরু করে তরুণ, যুবা, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাও রয়েছেন।

হাঁটা আইনত নিষিদ্ধ: ওসি জয়নাল আবেদিন

ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি জয়নাল আবেদিন বলেন, রেললাইন দিয়ে হাঁটা আইনত নিষিদ্ধ এবং বিপজ্জনক। তারপরও মানুষ প্রচলিত আইন অমান্য করে অসচেতনভাবে হাঁটতে গিয়ে চলন্ত ট্রেনে কাটা পড়ছে। প্রতিনিয়ত ট্রেনে কাটা পড়ে নিহতের ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতির জন্য জনগণকে সচেতন হতে হবে। সচেতনতার বাইরে এর কোনো সমাধান নেই।

জিআরপির এ কর্মকর্তা বলেন, ট্রেনের কাটার অধিকাংশ ঘটনাই ঘটছে মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণে। এ নিয়ে রেলপুলিশ মানুষকে সচেতন করার জন্যবিরামহীনভাবে প্রচারণা চালিয়েছে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না।

জয়নাল আবেদিন বলেন, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ, রেল লাইন ধরে হাঁটা, রেললাইন ধরে হাঁটার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ বিভিন্ন বিষয় সতর্কতা মূলক লিফলেট, ব্যানার প্রতিনিয়ত বিলি করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরে নিয়েও বৈঠক করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি কমলাপুর রেল স্টেশনে সতর্কতামূলক ডিজিটাল সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

প্রায়ই মিডিয়াতে প্রচারিত হচ্ছে দুর্ঘটনার খবর, প্রচার-প্রচারণা। তারপরও অনেকের বোধদয় হয় না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে রেল পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, রেল পুলিশের জনবল অনেক কম। ইচ্ছে করলেও রেলপথে অবৈধ জনচলাচল বন্ধ করা সম্ভব না। এ জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। আর সচেতনতা তৈরি না হলে দুর্ঘটনা কোনোভাবেই কমানো সম্ভব না।

সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে: রেল সূত্র জানায়, সারা দেশের রেলপথের দুই পাশে ১০ ফুট করে ২০ ফুট এলাকায় সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনানুযায়ী ঐ সীমানার ভেতর কাউকে পাওয়া গেলে তাকে আইনের ১০১ ধারায় গ্রেফতার করা যায়। এমনকি এই সীমানার ভেতরে গবাদিপশু চরলে আটক করে তা বিক্রি করে সেই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধানও রয়েছে।

বাস্তবতা হলো: আইনের ধারা-বিধান বই-নথিতেই লিপিবদ্ধ থাকে; সেগুলোর প্রয়োগ হয় না। প্রয়োগ করতে গেলে রেলওয়ে পুলিশকে বরং মুখোমুখি হতে হয় নানা বিব্রতকর পরিস্থিতি ও উটকো ঝামেলায়। সারা দেশে মোট রেলপথ ২ হাজার ৮৭৮ কিলোমিটার। আর অবৈধ রেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০টি।

এই অবৈধ ক্রসিং দিয়ে পারাপার, রেল লাইনের উপর দিয়ে অবাধে চলাচলসহ নানা কারণে প্রতি বছর গড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রতি বছর গড়ে প্রাণ হারাচ্ছে ২ হাজার মানুষ। আর এই লাশ দাফন বা লাশ দাহে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনকে বছরে গুনতে হচ্ছে ২ কোটি টাকা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments