শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে তিনদিন অফলাইন ও তিনদিন অনলাইন ক্লাস চালু ঘোষণা দিয়েছে। তবে শুধু কলেজ শাখার জন্য এটি প্রযোজ্য বলে জানিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ। গতকাল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রাজধানীতে বেইলি রোডে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শাখা অবস্থিত। এছাড়া ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরায় তিনটি শাখা রয়েছে। নোটিশে বলা হয়, কলেজ শাখার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আজ রবিবার থেকে তিনদিন অফলাইন (শনিবার, সোমবার ও বুধবার) ও তিন দিন অনলাইন (রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার) ক্লাস কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।
অনলাইন ক্লাসের রুটিন এবং ক্লাসে যুক্ত হওয়ার লিংক স্ব স্ব শ্রেণি শিক্ষকের মাধ্যমে ক্লাস গ্রুপে জানিয়ে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো বলে নোটিশে বলা হয়।
জানা গেছে, চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরীর স্কুল-কলেজে অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তবে স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এটি কার্যকর হতে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে দোটানার সৃষ্টি হয়েছে।
কোথাও অনলাইন, আবার কোথাও সশরীরে ক্লাসের সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও মান নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পরিকল্পনা এবং স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে এমন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি করতে পারে বলে আশংকা করছেন শিক্ষাবিদরা।
এদিকে অনলাইন ক্লাস নিতে না চাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শনিবার খোলা থাকবে কি না; সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি। যদিও শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দাবি করেছেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস নেবে না, তাদের জন্য ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তারা নির্দেশনা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের অন্তত ১৫টি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইন ক্লাসে না যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি তারা।
এতে করে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে। অনলাইন ক্লাস নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় শিক্ষার্থীরাও পড়েছে দোটানায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই জানে না চলতি সপ্তাহে তাদের সশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হবে নাকি বাসায় বসে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে হবে। ফলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়ছে।
অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, কেননা সন্তানদের নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা; দুটি বিষয়ই এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলেন, অনলাইন-অফলাইন ক্লাস নিয়ে স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশনা থাকাটা খুবই জরুরি।
জানা গেছে, রাজধানীর সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলতি সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে অনলাইন-অফলাইন ক্লাস। শিক্ষা মন্ত্রণাল থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান।
এর আগে ঢাকা মহানগরে মাধ্যমিক স্তরের কিছু স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য তিন দিন অনলাইন ও বাকি তিন দিন অফলাইনে (সশরীরে) ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
গত ৯ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার অনলাইনে ক্লাস হবে। অন্যদিকে, শনিবার, সোমবার ও বুধবার শিক্ষার্থীরা স্কুলে উপস্থিত হয়ে অফলাইন ক্লাসে অংশ নেবে। জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করবে। তবে গতকাল রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
নাজিরাবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর বাসায় বাটন মোবাইল: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে অনলাইন-অফলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে ৯ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী অনলাইন-অফলাইন ক্লাস করার বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
অনুষ্ঠানে পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের নাজিরাবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রোজিনা আক্তার শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আমার স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তৃণমূল পর্যায়ের। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সবজি বিক্রেতার সন্তানেরা পড়ে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর বাসায় বাটন মোবাইল, প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন পাবো কি না? সে ক্ষেত্রে আমি কী করতে যাবো?
এসব শ্রেণির স্কুলের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, না। আপনাকে আমরা ইনক্লুড করিনি। আমরা বলছি, নামিদামি স্কুলগুলো, যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি গাড়ি নিয়ে আসে, সেই স্কুলগুলোর জন্য। আপনাকে আমরা এ বিষয়ে ইনসিস্ট করছি না। যেগুলো ভালো স্কুল, সেগুলো আস্তে আস্তে শুরু করুক। তালিকাগুলো আমরা দেবো।
অন্য স্কুলগুলো সপ্তাহে পাঁচ দিন না ছয় দিন স্কুল করবে প্রশ্নে এহছানুল হক মিলন বলেন, তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তারা তাদের মতো করে ক্লাস করবে। অর্থাৎ আগের মতো পাঁচ দিন ক্লাস করবে বলে জানান মন্ত্রী। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর আগামী জুলাই থেকে ও লেভেল, এ লেভেল পরীক্ষা, তারা অনলাইনে যেতে চাইছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবার সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য কী সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, সেগুলো আরেকটি বিষয়। পরে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না: রুবিনা ফেরদৌসের দুই মেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী। রুবিনা ফেরদৌস বলেন, ‘আমার হাজবেন্ড দেশের বাইরে থাকেন। আমি একটা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। ফোনটা আমার, সেটা নিয়ে অফিসে যাই। বাসায় শ্বশুর যে মোবাইল ব্যবহার করেন, তা দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যায় না। আমার মোবাইলটা যদি বাড়িতে রেখেও যাই, তবুও তো দুই মেয়ে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে না। এখন ওদের জন্য কি জনে জনে মোবাইল কিনতে হবে? এটা কি হুট করে বললেই সম্ভব?’
শুধু রুবিনা ফেরদৌস নন, অনলাইন ক্লাসের ঘোষণায় দিশাহারা অধিকাংশ অভিভাবক। তাও আবার খোদ রাজধানীতে বসবাসকারীরা। ঢাকার বাইরে কিংবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস চালু হলে এ সংকট আরও প্রকট হবে।



