বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ৩৫টি ড্রেজার ও জলযান কেনাকাটায় দুর্নীতির তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকার এই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেকসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেককে তলব করে দুদক তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিয়েছে। এরপর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দুর্ণীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ থেমে গেছে।
এ ব্যাপারে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মো. রাকিবুল হায়াত বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেকের কাছ থেকে কমিশন বক্তব্য নেয়ার এক বছর পার হলেও অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ হযনি। অভিযোগের তদন্ত বন্ধ হয়নি। যেহেতু প্রকল্পটি চলমান, তাই তদন্তও চলমান। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হলে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এ ছাড়া এখন কমিশনও নেই। কমিশন গঠিত হলে তদন্ত কার্যক্রমে গতি ফিরবে।
তিনি বলেন, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।অভিযোগের প্রমাণ মিললে মামলা দায়েরসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও করা হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে অক্টোবর মাসে বিআইডব্লিউটিএ’র জন্য ৩৫টি ড্রেজার, ১৬১টি জলযান সংগ্রহ, ৩টি ড্রেজার বেইজ নির্মাণ ও একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এতে মোট ভ্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
২০২৩ সালের জুন মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্ন্ত বাড়ানো হয়। সেই সাথে ব্যয় ২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা করা হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটির মেয়াদ।
সময়মতো কাজ না হলেও এই প্রকল্পের ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনাসহ প্রতিটি স্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখার প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ড্রেজার ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন সংশোধন করে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু কেনাকাটায়ই নয়, ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’ বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের নামে বিপুল পরিমান অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্য ও আলামত পেয়েছে দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট টিম।
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘৩৫টি ড্রেজার ও সহায়ক জলযান ক্রয়’ প্রকল্পে দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আলী আজগর ফকির দুদকে অভিযোগ করেন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে অভিযোগটি গ্রহণযোগ্য হওয়ায় এতে সাবেক নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক, বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
এর প্রেক্ষিতে কমিশনের সহকারী পরিচালক মো. রাকিবুল হায়াতকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তিনি ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি এবং গোলাম সাদেকসহ বিআইডিব্লউটএ’র ৬ কর্মকর্তার নথি তলব করেন। পরে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেককে দুদকে তলব করা হয়।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন দুর্নীতি বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর পর একটা দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর সঙ্গে যেহেতু সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর নাম জড়িত, তাই আমি মনে করি, দুদককে এ ব্যাপারে আরও কঠোরভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। নইলে দুদককে আবারও নখ-দন্তহীন বাঘ হিসেবেই বিবেচনা করবে সাধারণ মানুষ, যা আমরা চাই না।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, রিয়ার এডমিরাল (তৎকালীন কমোডর) গোলাম সাদেক ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রেষণে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারপদে যোগদান করেন। তিনি মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্প ও কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠে।
২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৫ সদস্যের কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপেক্ষা করে তিনি ২ কোটি টাকায় ‘নগরবাড়ী-কাজিরহাট-নরাদহ নদী বন্দর’ এলাকার শুল্ক আদায় কেন্দ্র বা ঘাট ইজারা অনুমোদন করেন। অথচ এই ঘাটের বার্ষিক ইজারা মূল ছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে দুই অর্থবছরে সরকারের প্রায় ৬ কোটি ৮১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
ঘাট ইজারায় এই দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২২ সালে দুদকের কমিশন সভায় গোলাম সাদেকের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করা হয়। তবে তৎকালীণ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের তদবিরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে দুদক। কমিশন সভায় অনুমোদনের পরও মামলা থেকে বাদ দেওয়ার এমন ঘটনা দুদকের ইতিহাসে বিরল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


