১৫০ বছরের পুরানো বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষনা করলেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার দুপুর সোয়া ১২টায় পৌরসভা চত্বরে সিটি কপোরেশন উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে ১৮৭৬ সালে স্থাপিত বগুড়া পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলো। এর মধ্য দিয়ে ১৩তম নগর সংস্থা হিসেবে বগুড়া সিটি করপোরেশন যাত্রা করল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার বগুড়া সফরে এসেছেন। তিনি সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে সড়কপথে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দেন। সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তিনি বগুড়া সার্কিট হাউসে পৌঁছান। এ সময় বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।
ফলক উম্মোচন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের আশা ও প্রত্যাশা ছিল, বগুড়া শহরটি একটি সিটি করপোরেশন হবে। আমরা ২০০১ সাল থেকে এর কাজ শুরু করেছিলাম। একটি সিটি করপোরেশনের যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন, তার বেশির ভাগই আমরা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলাম। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। তবে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশনের যাত্রা শুরু হলো।’
তারেক রহমান বলেন, কিন্তু নিজের শহর নিজেকে পরিষ্কার রাখতে হবে। স্টেশন সড়কে দেখলাম দুপাশেই ময়লা। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রশাসন প্রশাসনেরটা করবে। নিজের ঘর নিজেকে পরিষ্কার রাখতে হবে। যাঁরা সিটি করপোরেশনে বাস করবেন, নিজেদের যত্ন নিজেদের নিতে হবে। বগুড়াকে মডেল শহর হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে সরকার একা পারবে না। শহরের মানুষ যদি চেষ্টা না করে, সবাই একসঙ্গে কাজ না করলে সরকারের পক্ষে মডেল শহর গড়া সম্ভব নয়।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি বগুড়ার সন্তান; আপনাদের সন্তান। আগে শুধু বগুড়ার কাজ দেখতাম। সারা দেশের মানুষ দায়িত্ব দিয়েছে; এখন সারা দেশের কাজ দেখতে হচ্ছে। আপনারা দোয়া করবেন, বগুড়ার মানুষের মতো সারা দেশের মানুষের জন্য যেন কাজ করতে পারি, কমবেশি সমস্যার সমাধান করতে পারি।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজ জেলা বগুড়ায় এটি তারেক রহমানের প্রথম সফর। সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান সঙ্গে আছেন।
ঐতিহাসিকভাবে বগুড়া পৌরসভার যাত্রা শুরু হয় ১৮৭৬ সালের ১ জুলাই, ব্রিটিশ শাসনামলে। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন পৌরসভাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। পৌরসভাটির অধীনে বর্তমানে ২১টি ওয়ার্ড রয়েছে এবং ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এর জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ।
২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় আশপাশের ৪৮টি মৌজা যুক্ত করে পৌরসভার আয়তন বাড়িয়ে ৬৯.৫৬ বর্গকিলোমিটার করা হয়। একই সঙ্গে ওয়ার্ডসংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১ করা হয়। তখনই এটিকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘ দুই দশকেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মীর শাহে আলম, বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জজ আদালতে ই-বেইল বন্ড সেবার উদ্বোধন
বগুড়া জজ আদালতে ই-বেইল বন্ড সেবার (ই-বেইলবন্ড হচ্ছে আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর জামিননামা সরাসরি ও দ্রুততম সময়ে কারাগারে পাঠানোর অনলাইন সিস্টেম) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বগুড়া আদালত ভবন থেকে মোট সাত জেলায় এ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান।
বগুড়া ছাড়াও ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়ায় এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। জামিন প্রক্রিয়া সহজ করা, দুর্নীতি কমানো এবং বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি দূর করতে সরকার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
সোমবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর বগুড়া সার্কিট হাউসে পৌঁছায়। সেখান থেকে ১১টার দিকে সরকার প্রধান হেঁটে জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে পৌঁছান এবং বগুড়া জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত কোর্ট বিল্ডিংয়ের ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
বগুড়া জজ আদালতে ই-বেইল বন্ড সেবার ভবনের ফলক উন্মোচন শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ন্যায্যের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের ভূমিকাই মুখ্য। ফ্যাসিবাদী আমলে বিচার ব্যবস্থা দলীয়করণ করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী আমলে রাতের আধারে আদালত বসিয়ে আইনের নামে বেআইনি শাসন চালানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আদালত হয়রানির জায়গা নয়, মানুষের আস্থার জায়গা। ই-বেইল বন্ডের মাধ্যমে জামিনে হয়রানি বন্ধ হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তির পর জনগণের ভোটে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছে। সময়ের দাবি, যেন আর ফ্যাসিবাদ চেপে না বসে। আইন, বিচার ও শাসন সমন্বয় করতে পারলে গণতান্ত্রিক অধিকারের সুফল মিলবে।’
তিনি বলেছেন, “আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর আদালতের বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে জামিননামা হাতে পৌঁছাতে কয়েকদিন সময় লাগার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কারামুক্তি হতে দেরি হয়। এটি আইনের শাসন হলেও ন্যায্যবিচার কি না এ নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ হয়তো রয়েছে।
এ সময় বগুড়া কোর্ট ভবন নির্মাণ খরচ বাবদ ১৫ লাখ এবং লাইব্রেরি বই কেনা বাবদ ৫ লাখ; মোট ২০ লাখ টাকা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে, গার্ড অব অনার শেষে বগুড়া জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনের ফলক উন্মোচন করেন তিনি।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন
দুপুরে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়িতে গিয়ে শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে দ্বিতীয় ধাপের ৯১১ জনের হাতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ পাইলট কার্যক্রমের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি মূলত নিম্নআয়, অসচ্ছল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে যে পরিকল্পনাটির ধীরে ধীরে ছক এঁকেছি। সেই পরিকল্পনার অনেকগুলো অংশের একটি ছিল এই ফ্যামিলি কার্ড। আল্লাহর কাছে হাজারো কোটি শুকরিয়া- আজ নিজের বাড়িতে মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার মতো অবস্থায় এসেছি। এটি আজ বাস্তবায়ন করতে পেরেছি- আলহামদুলিল্লাহ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন, আজ এখানে ৯১১ জন মা-বোনকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। তবে যারা বাকি আছেন পর্যায়ক্রমে তারা সবাই ইনশাআল্লাহ পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় যে দুর্নীতি হয়েছে তার মাধ্যমে দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আমরা এই দুর্নীতিকে রোধ করতে চাই। এটা জনগণের টাকা, জনগণের অর্থ পাচার হয়েছে। সেই টাকা দিয়ে আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড করব। দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকারের আগামী ৫ বছরের পরিকল্পনার মধ্যে অধিকাংশ পরিকল্পনা গ্রামের মানুষকে ঘিরে। দেশের ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামের বাস করে। এই মানুষগুলোকে ঘিরে আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।
এ অনুষ্ঠানে বিএনপির দলীয় সঙ্গীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ পরিবেশন করা হয়। এ সময় দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলান সরকারপ্রধান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। তাতে শামিল হন সমাজকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ হোসেন। সমর্থকরাও দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলান।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী বাগবাড়ির জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। এছাড়া বাগবাড়ির নশিপুরে তারেক রহমান কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চৌকিদহ খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। বিকেলে প্রায় ২০ বছর পর প্রয়াত রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়ি জিয়া বাড়িতে যান প্রধানমন্ত্রী। তিনি এক নজর বাড়িটি পরিদর্শন করেন।


